বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ

চলতি বোরো মৌসুমে ঘরে ধান তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন হবিগঞ্জের কৃষকেরা। একদিকে মরণব্যাধি করোনার প্রাদুর্ভাব, অন্যদিকে ধান কাটার শ্রমিকের অভাব ও আগাম বন্যার আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন তারা।

জেলার ৯টি উপজেলায় হাজার হাজার হেক্টর জমিতে পাকতে শুরু করেছে বোরো ফসল। কোথাও কোথাও শ্রমিক সংকট নিয়ে ধান কাটাও শুরু হয়েছে।

কৃষকরা জানান, অন্যান্য বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিকরা ধান কাটতে আসতেন। কিন্তু এবার করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে যোগাযোগ বন্ধ ও বিভিন্ন জেলায় লকডাউন থাকায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে প্রকটভাবে। ফলে ঝড়-বৃষ্টি ও আগাম বন্যা দেখা দিলে মাঠেই পচবে তাদের সোনালী ফসল।

এদিকে হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী ৪ দিনের বৃষ্টিপাতে হবিগঞ্জে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশ, ভারত  আবহাওয়া অফিস, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভিত্তিক আবহাওয়া সংস্থা (ইসিএমডব্লিউএফ) ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আবহাওয়া সংস্থার বরাত দিয়ে পাউবো  জানায়, ১৭ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন ভারতের মেঘালয় ও আসামের বরাক অববাহিকায় ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে হবিগঞ্জ সুনামগঞ্জ সিলেট মৌলভীবাজার ও নেত্রকোনা জেলার নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে নদী সংলগ্ন এলাকায় স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

২১ এপ্রিলের পর বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সূত্রমতে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য সংলগ্ন হবিগঞ্জ জেলায় উল্লেখিত সময়ে ১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হতে পারে।

হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলার ৯টি উপজেলায় মোট ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে ব্রি-২৮ ও হাইব্রিড জাতের বোরো জমি আবাদ হয়েছে।

এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার হেক্টর। এতে ৪ লাখ ৭০ হাজার মে. টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

বানিয়াচংয়ের কৃষক হারুন উল্লা বলেন, সাড়ে তিন একর জমিতে ধান কাটার জন্য এখনো  শ্রমিক যোগাড় করতে পারিনি। ইতোমধ্যে বিআর- ২৮ ধান পেকে গেছে। সময়মতো ধান কাটতে না পারলে জমিতেই ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।

অন্যদিকে বাকি জাতের ধান আগামী ১০ দিনের মধ্যে কেটে শেষ করতে হবে। না হয় হাওরে পানি চলে আসবে। এখন কি করব বুঝে উঠতে পারছি না।

একই উপজেলার কাগাপাশা গ্রামের ফুল মিয়া বলেন, ধান কাটার শ্রমিকের সাথে আলোচনা করার সুযোগই দিচ্ছে না পুলিশ। এক জায়গায় বসে মজুরি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে করোনা সংক্রমণ হবে বলে পুলিশের ধাওয়া খেয়েছি।

যোগাযোগ করা হলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. তমিজ উদ্দিন খান জানান, শ্রমিক সংকট পুষিয়ে উঠার জন্য প্রত্যেকটি উপজেলায় ১৮ থেকে ২৭ জন শ্রমিক নিয়ে একটি ‘লেবার পুল’ গঠন করা হয়েছে। তারা কৃষকদের ধান কেটে দেবেন। এই পুলের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বানিয়াচঙ্গে ধান কাটা শুরু হয়েছে।

বৃষ্টিপাত ও আগাম বন্যার আগে যাতে ধান কাটা শেষ হয় প্রয়োজনে হাওড় এলাকায় কম্বাইন্ড হারবেস্টর ও রিপার মেশিন ব্যবহার করা হবে।

বুধবার দুপুরে যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, তিনি বানিয়াচঙ্গের একটি হাওড়ে ধান কাটা কার্যক্রম পরিদর্শনে এসেছেন।

তিনি বলেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ সিলেট সিরাজগঞ্জ ময়মনসিংহ থেকে আনা ১১০ জন শ্রমিক দিয়ে ধান কাটা শুরু করেছি। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডার থেকে এক সপ্তাহের জন্য খোরাকি হিসেবে তাদেরকে ২শ কেজি চাল, ৫০ কেজি ডাল, আলু ও প্রয়োজনীয় তেল সরবরাহ করা হয়েছে।

তিনি জানান, প্রত্যেক উপজেলাতেই একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কৃষকরা জানান, বোরো ফসল উঠিয়েই ধান বিক্রি করে ধান কাটার শ্রমিক, মাড়াই এবং ঋণ পরিশোধ করতে হয়। এ সময় প্রতি বছর ধানের দাম একদম কম থাকে। এবার করোনার কারণে ধানের দাম আরো কমে যাওয়ার শঙ্কা করছেন তারা।

এমনটা যদি হয় তবে কৃষকরা এবারো ঋণের বোঝা কমাতে পারবে না। এ অবস্থায় উচ্চ সুদে ঋণ পরিশোধসহ উৎপাদনের খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হবে কৃষকদের।