বাংলাদেশি আধুনিক গানের অন্যতম মেধাবী গীতিকার আসিফ ইকবাল। নামি-দামী শিল্পীরা তার কথায় কণ্ঠ দিয়েছেন। যাদের সঙ্গে রয়েছে তার হৃদ্যতা। তাদের মধ্যে বিশেষ একজন সামিনা চৌধুরী, যাকে আসিফ বলছেন সুমা আপা।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ফেইসবুকে দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন এই গীতিকার। যেখানে তুলে ধরেন সামিনা চৌধুরীর সঙ্গে সম্পর্ক ও গানের জগতের অনেক কথা। সঙ্গে শেয়ার করেন পুরোনো একটি গানের ভিডিও।
সেখানে জানা গেল, নতুন গান লিখলে সবার আগে সামিনার কথা মনে পড়ে আসিফ ইকবালের।
দেশ রূপান্তর পাঠকদের জন্য সেই লেখাটি তুলে ধরা হলো-
“আমাকে গান লেখায় এনেছিলেন চট্টগ্রামের ফিলিংস ব্যান্ডের প্রাক্তন ব্যান্ড লিডার সৈয়দ মনসুর ভাই। তবে আমি আমার গানের জন্যে গুরু হিসেবে জানি নকিব ভাইকে। আর যাঁদের স্নেহধন্য আমি তাঁদের মধ্যে বাচ্চু ভাই, সামিনা চৌধুরী আর কুমার বিশ্বজিতের কথা বলতেই হবে।
আমার গান লেখায় উৎসাহ যোগানোর জন্যে যদি একজনের নাম বলতে হয় তবে সামিনা চৌধুরীর (সুমা’পা) নাম সবার আগে আসবে। আমি যেমন সুমা আপার গানের মুগ্ধ ফ্যান ছিলাম সুমা’পাও ছিলেন আমার গানের অন্ধ সাপোর্টার। কিছু লিখলেই সবার আগে আমি সুমা’পাকে পড়ে শুনাতাম। পঞ্চমের মতোই আমাকে আদর করতেন সুমা’পা। উনারা তখন মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে থাকতেন। সুমাপার কারণে আন্টি, নুমা’পা, নুমা’পার প্রয়াত হাজব্যান্ড ফাইয়াজ ভাই, অন্তরা, পঞ্চম সবার সাথে খুব ভালো হৃদ্যতা হয়ে গিয়েছিলো। সুমা’পার ব্যাগে যে আমার কত্ত গান থাকতো! আহা। কী সব দিন ছিলো সেগুলো। আবিদ হোসেনের সুরে আমার প্রথম প্রকাশিত গান ‘একদিন মায়ার পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবো দূরে কোথাও যার ঠিকানা জানি না’ সুমা’পা তাঁর প্রথম এলবামে ঠাঁই করিয়ে দিয়েছিলেন নিজেরই একান্ত আগ্রহে। এই হলেন সামিনা চৌধুরী - আমাদের সুমা’পা।
এরপর সুমা’পা-নুমা’পা (ফাহমিদা নবী) দু’বোনের জন্যে করেছিলাম নকিব ভাইয়ের (নকিব খান) সুরে ‘আমার সকল সুখে বুবু তোর অনেক ঋণ, আরে বোকা মেয়ে তুই ছাড়া কি সত্যি হতো এমন সুখের দিন’ গানটা। এই গানটা বিটিভিতে সদ্য প্রয়াত রিয়াজুদ্দীন বাদশা ভাই তাঁর এক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে প্রচার করেছিলেন। সেই গান বিটিভিতে যে কতো শতোবার বেজেছিলো সে আমি হিসেব করতে পারবো না। এ গানের পর ১৯৯৩ সালে আমি চাকরির কারণে চট্টগ্রাম চলে আসি। স্বভাবতই গান লেখায় তখন অনিয়মিত হয়ে পড়ি।
টুলু ভাই এর সাথে আমার পরিচয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সারগামের বিজয় নগরের রেকর্ডিং স্টুডিওতে। উনি প্রচুর মিক্সড এলবাম করতেন। উনি আর্ক ব্যান্ডে দু’টি এলবাম করেন একটি মুক্তিযুদ্ধ অন্যটি তাজমহল। মুক্তিযুদ্ধ থেকেই পঞ্চম আর টুলু ভাই একসাথে। ঐ সময় টুলু ভাই কিন্তু আমারে মোটেও পাত্তা দিতো না। সাইডও দেয় নাই। সালটা সম্ভবত ১৯৯৭। টুলু ভাই সুমা’পার (সামিনা চৌধুরী) জন্য একটা এলবাম করবেন। সুমা’পার কাছে আমার অনেক গান ছিলো। এর মধ্য থেকে দু’টা গান সুমা’পাই টুলু ভাই কে দিলেন। আমি কিন্তু কিছুই জানি না। এই দুই গানের একটা ছিলো সুমা আপার বাবা শ্রদ্ধেয় মাহমুদুন্নবী স্যারের জন্যে লেখা গান ‘যে অভিমানে আমি কষ্ট দিয়েছি তোমায়, তার অনুতাপে দিন কাটে রাত চলে যায়, জানি না তুমি ঋণী করে গেছো কিনা – ক্ষমায়’ আর অন্যটা হচ্ছে আমার ফেভারিট গানগুলোর অন্যতম – ‘কোনো অভিযোগ না রেখেও জানি মন বড় অসহায়, তবু যেখানেই থাকো যেভাবেই থাকো শুভেচ্ছা তোমায়।’ ভাইরে সে কি সুর। মাথা নষ্ট করা অদ্ভুত সুন্দর সুর! আর সেরকম গায়কী। আর ‘তোমাকে নিয়ে এতো আয়োজন’ গানটা টুলু ভাই নিজে চেয়ে আমার কাছ থেকে নিয়েছিলেন। এই তিনটি গানই ছিলো ওই এলবামে। আমার খুব পছন্দের কাজ। আমার তিনটা ভীষন ভালোলাগার গান। এর মধ্যে প্রথম দু’টো গান আর আমার কাছে নেই। টুলু ভাই এর সৌজন্যে আজ ‘তোমাকে নিয়ে এতো আয়োজন’ গানটা পেলাম আর আপনাদের শোনার জন্য দিলাম। ওই দুটো গান কারও কাছে থাকলে আমাকে দিলে কৃতজ্ঞ থাকবো।
এই গান করার পর টুলু ভাই নম্বর জোগাড় করে আমাকে ফোন দিলেন। বললেন আরও গান দাও। দিলাম। ১৯৯৭ তে যখন টুলু ভাই সুমা’পার এই এলবাম রিলিজ করলেন তার পরের বছরই ‘এই দূর পরবাসে’ গানটা করলেন। সে গান তো এক ইতিহাস। টুলু ভাই তখন তাজমহল রোডে থাকতেন। সেখানেই গানটা সুর করা। মনে আছে এক সন্ধ্যায় এই গান নিয়ে বসতেই গিয়েছিলাম টুলু ভাই এর বাসায়। সে গল্প আর একদিন হবে।
আজ শুধু গানের এই দুই উদার মনের মানুষের কথা বলেই শেষ করি যাঁদের কারণে আমার আসিফ ইকবাল হয়ে ওঠা। এখনও গান লিখলেই সবার আগে সুমা’পার কথা মনে পড়ে। মনে হয় ইস যদি লেখাটা সুমা’পাকে দেখাতে পারতাম।”
সেই স্ট্যাটাসে মন্তব্য করেছেন সামিনা চৌধুরী, ফাহমিদা নবী-সহ অনেকেই।