করোনার মরণ কামড়ে বিশ্ব আজ স্তম্ভিত, স্থবির ও নিশ্চল; মানুষ আজ শঙ্কিত, প্রাণভয়ে সে আজ পরিবার পরিজন নিয়ে গৃহবন্দি, পরিবারের সদস্যরা আবার একেকজন একেক কামরায় আধৃত; অতি স্বল্প পরিসরেও একজন আরেকজন থেকে অযুত মাইল দূরে অবস্থিত। কত দিন এই দুর্যোগের মধ্যে পৃথিবী থাকবে, তা কেউ বলতে পারে না। কিছুটা বিলম্বে হলেও বাংলাদেশ এই অনিশ্চিত গ্যাঁড়াকলে এখন আটকা পড়ে গেছে। দুই দফায় ঘোষিত মোট ২০ দিনের ছুটিকে কর্তৃপক্ষ করোনা মোকাবিলায় আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ (লকডাউন) হিসেবে বিবেচনা করলেও, সমন্বয়ের অভাবে তা অনেকাংশে হয়ে গেছে বিপরীত ফলদায়ী প্রয়াস; প্রথম যাত্রায় ছুটির আমেজে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার পরিবর্তে সবাই গাদাগাদি করে গ্রামে যাত্রা করল আর দ্বিতীয় দফায় একই কায়দায় বহু শ্রমিক অবর্ণনীয় কষ্টে গাঁটের পয়সা খরচ করে, অনেকে হেঁটে চলতি মাসের ৪ তারিখে ঢাকায় এসে ছুটির কথা শুনে আবার বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করল।
এটা করোনা দমনে, না বর্ধনে অবদান রাখল, তা বিশেষজ্ঞরা বিশ্লেষণ করে দেখতে পারেন। তবে এতে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের যে ক্ষতি হলো, তা এক কথায় অবর্ণনীয়। এ সময় আমরা শুধু ব্যয় করেছি; সতর্কতায় অতিরিক্ত ব্যয় করেছি অথচ কোনো আয়-উৎপাদন করিনি, করলেও তার পরিমাণ সামান্যই। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর, বিশেষত যারা দিন এনে দিন খায় তাদের। অন্যসব হিসাব বাদ দিলেও এই ছুটির নিষ্কর্মা ২০ দিন বিবেচনায় নিলে বছর ভিত্তিতে তার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থাৎ এই শ্রেণির মানুষ এখন থেকে প্রতিদিন ঠিকঠাকমতো কাজ করতে পারলেও এ বছর গত বছরের আয়ের শতকরা ৯৪ দশমিক ৫ ভাগের বেশি উপার্জন করতে পারবে না। তার ওপর সম্ভাব্য মন্দা কাটানোর লক্ষ্যে প্রবর্তিত বিভিন্ন প্যাকেজের প্রভাবে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে গেলে তাদের নিট আয় আরও কমে যাবে। ফলে প্রান্তজনদের একটা অংশের দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়ে গেছে। যদিও এডিবি অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশের প্রবৃদ্ধি-হারের যে সংশোধিত প্রাক্কলন প্রকাশ করেছে, তা বেশ আশাব্যঞ্জক; ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। করোনার প্রভাবের চরমতম দিকটি হলো এটা আমাদের একেবারে অমানবিক করে ফেলেছে। ‘করোনা সন্দেহে ৫ হাসপাতাল চিকিৎসা দেয়নি’, ‘করোনা সন্দেহে সঙ্গীকে লোকজন বাসস্ট্যান্ডে ফেলে গেছে’, ‘প্রবাসী সন্দেহে বৃদ্ধকে গণধোলাই’, ‘তীব্র জ্বরে আক্রান্ত যুবকের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু’, ‘করোনায় মৃতের সৎকার ও দাফনে বাধা’Ñ এই জাতীয় শিরোনামযুক্ত সংবাদ এখন হরহামেশাই দেখা যাচ্ছে। খুসখুসে কাশি আমার আজীবন সঙ্গী।
ডায়াবেটিসের রোগী হওয়ায় এই অঘোষিত লকডাউনের মধ্যেও আমি মাস্ক পরে ভোরে একটু শরীর চর্চা ও হাঁটার জন্য রবীন্দ্র সরোবরের লেক পাড়ে বের হই। সম্ভবত এই জাতীয় সংবাদ পড়ে এবং আমার শতভাগ গৃহবন্দি না হয়ে থাকার আচরণে আমার মেয়ে ও জায়া এখন আমার কাছে বসতে এবং খেতে ইতস্তত বোধ করছে। এর মধ্যে যদি কখনো জ্বর আসে (যেটা আগে বিনা নোটিসে মাঝেমধ্যেই উদয় হতো) তাহলে আমার যে কী অবস্থা হবে, তা সহজেই অনুমেয়; আমি হব পরিত্যক্ত এবং পুরোপুরি সৃষ্টিকর্তার ওপর সমর্পিত। আমার এক ডাক্তার আত্মীয় রাজশাহীতে একটি ক্লিনিক চালাতেন, ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার জন্য স্ত্রী ঢাকায় থাকেন। এখন সেই ডাক্তার সাহেব ক্লিনিক বন্ধ করে ঢাকায় এসে স্ত্রীকে সঙ্গ দিচ্ছেন প্রায় মাসখানেক হলো। এক বন্ধু বললেন, আরেক হৃদয়বিদারক কাহিনী। স্বামী-স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশনে চলে গেছেন। কারা যেন দয়াপরবশ হয়ে ছোট ছোট দুটি বাচ্চাকে গ্রামের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু সেখানে তাদের ঘরবাড়ি, আত্মীয়-স্বজন সবই আছে; কিন্তু তাদের দেখার কেউ নেই; দুই শিশু সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও আছে অনেক; অনেক চিকিৎসক, নার্স ও প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি নিয়ে সেবাদানে আগুয়ান হয়েছেন, হচ্ছেন সবার কাছে নন্দিত।
আগে যখন কলেরা ও গুটিবসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব হতো, তখন দেখেছি মৃত্যুর মিছিলে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। রোগের মৌসুম শেষ হলে মানুষ বলত অন্তত এক বছরের জন্য হায়াত বাড়ল। এসব রোগে শহরাঞ্চলে মৃত্যুর হার কত ছিল জানি না, তবে গ্রামাঞ্চলে দেখেছি তা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের নিচে ছিল না। অত্যন্ত ছোঁয়াচে ওইসব রোগে আক্রান্ত মানুষও তখন যথেষ্ট সেবা পেত। আর এখন মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ মৃত্যুর ঝুঁকিযুক্ত করোনার রোগীর চিকিৎসক নেই, কোনো সেবাদানকারী নেই, নেই কোনো শুভাকাক্সক্ষীর দর্শন। এমনকি দাফন-কাফনেও এর লাশ অপয়া। অনেক ক্লিনিক ও হাসপাতালের দ্বার সাধারণ জ্বর-কাশি ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য বন্ধ। এর চেয়ে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি আর কী হতে পারে! আসলে আমরা বোধ হয় আগের চেয়ে কিছুটা বেশি জানার ফলে আরও বেশি আত্মকেন্দ্রিক ও বেশি স্বার্থপর হয়ে গেছি; হয়ে গেছি অমানবিক, নির্দয় ও নিষ্ঠুর। কিন্তু প্রশ্ন হলো এভাবে কত দিন চলা সম্ভব? বাংলাদেশের মানুষের যে চরিত্রগত আচরণ ও সাধারণ মানুষের যে আর্থিক সামর্থ্য, তাতে দীর্ঘদিন দেশ লকডাউন থাকলে তা রোগ-বিস্তার রোধে যতটুকু ফলদায়ী হবে, তার চেয়ে এর বিরূপ অর্থনৈতিক প্রভাব হবে অনেক বেশি মারাত্মক। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৭ শতাংশ হয় অনানুষ্ঠানিক খাতে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে এ খাতে নিয়োজিতদের মাত্র ১৫ শতাংশের প্রতিদিনের আয় ৫০০ টাকার বেশি। বাকিরা দিন এনে দিন খায় এবং এই আয়ের একটা অংশ গ্রামে বসবাসরত পরিবার-পরিজনের জন্য কষ্টেশিষ্টে প্রেরণ করে। ২৬ মার্চ থেকে অঘোষিত লকডাউন শুরু হওয়ায় এই অনানুষ্ঠানিক খাতের যে প্রায় এক কোটি লোক ঢাকা ছাড়ল, তাদের এখন চলবে কীভাবে? সরকার অবশ্য এই শ্রেণির জন্য খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দানের বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কিন্তু এই অবরুদ্ধ সময়ে জরুরি ভিত্তিতে সবার কাছে নিরাপদ পন্থায় এই সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এক পর্বতসম চ্যালেঞ্জ। সেদিন দেখলাম ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করে এরূপ একজনকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ভ্যানওয়ালার সোজাসাপটা উত্তর : ‘আমাদের পেট চলে না, ভাইরাসের খবর কে রাখে।’ এই পরিস্থিতিতে দারিদ্র্যসীমার নিকটে যাদের অবস্থান, তাদের একটা অংশ দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আবার প্রত্যাবর্তন করতে পারে। আবার দেশব্যাপী লকডাউন প্রলম্বিত হলে সরকার করোনা-প্রভাবিত মন্দা কাটাতে সরকার যে প্যাকেজগুলো প্রবর্তন করেছেন, সেগুলোর সুবিধা পুরোপুরিভাবে ব্যবহার করে ঈপ্সিত ফললাভের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হবে। আমাদের যে ভঙ্গুর স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যবিধি পালনের দুর্বল শিষ্টাচার সে বিবেচনায় করোনার আগ্রাসী থাবা ঠেকাতে আক্রমণাত্মক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে কভিড-১৯ দেশের কোনো কোনো জনসমাজে গুচ্ছাকারে দৃশ্যমান হচ্ছে; এখনো সারা দেশ সংক্রমিত হয়নি। এখন এই গুচ্ছভিত্তিক সংক্রমণ সংযত করার জন্য অতি-আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য জুতা আবিষ্কারের প্রচেষ্টার মতো সারা দেশ চামড়া দিয়ে না মুড়িয়ে বরং পা চামড়া দিয়ে মোড়ানোর ব্যবস্থা করার আদলে আক্রান্ত এলাকা বা বসতবাড়ি কঠোরভাবে লকডাউন করার ব্যবস্থা নেওয়া হলে ব্যবস্থাপনার দিক থেকে তা হবে নিয়ন্ত্রণসাধ্য এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে সহনীয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুরনো প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী যত দ্রুততার ও দক্ষতার সঙ্গে বেশি বেশি করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারব, রোগী বিচ্ছিন্ন করতে পারব এবং যতটা পারি তাদের জন্য ব্যবস্থাপনা করতে পারব, ততই আমরা সীমিত সম্পদ দিয়েও উত্তম ফললাভ করতে পারব।
ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রোগীরা যেমন পরিবার ও সমাজের কাছে অচ্ছুত হয়ে যাচ্ছে, মানবিক বিপর্যয়ের পরাকাষ্ঠা হয়ে যাচ্ছে, তা অপনোদনের লক্ষ্যে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের সহজলভ্য ও সুলভকরণ অতীব জরুরি। সরকারের সঙ্গে দেশের ধনিক সম্প্রদায় সহযোগিতা করলে এটা এমন কোনো দুঃসাধ্য কাজ নয়। মাইক্রোসফটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত দানবীর বিল গেটস দ্রততম সময়ের মধ্যে করোনার টিকা উদ্ভাবনে ও তা সাধারণে পৌঁছে দিতে উদ্ভাবনী পদ্ধতিতে যেভাবে অকাতরে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন, সেখান থেকে তাদের প্রেরণা সঞ্চারিত হওয়া উচিত। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিখ্যাত অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনও এ সময় এক লাখ অসহায় মানুষকে খাদ্য ও অর্থ সাহায্য দিয়ে অনন্য নজির তৈরি করেছেন। আমাদের দেশের বিত্তশালীরাও সহৃদয়তার পরিচয় দিয়ে এ সময় এগিয়ে আসতে পারেন। সেই সঙ্গে চিকিৎসক, পরিসেবক ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানবিক বিপর্যয়ের এই চরম মুহূর্তে দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে গণমাধ্যমে নানা ধরনের প্রেরণাদায়ী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা প্রয়োজন। আমরা আশা করি, সরকারের পাশাপাশি দেশের সব গণমাধ্যম এ কাজে এগিয়ে আসবে।
লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক