লকডাউনের ফাঁদে অভিবাসী শ্রমিকরা

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির উত্তরের শহরতলির রাস্তায় প্রায় দিনই দয়ারাম কুশওয়াহা ও তার স্ত্রী জ্ঞানবতীকে দেখতে পাওয়া যাবে। পাঁচ বছরের সন্তানকে নিয়ে তারা ইট ভাঙতে আসেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে দেশব্যাপী দেওয়া লকডাউনের মধ্যে আর তাদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু ঘরের জন্য খাবার কেনা ও ভাড়া দেওয়ার তাগিদ থেকে বাঁচতে লকডাউনের মধ্যেই দয়ারাম তার সন্তানকে কাঁধে নিয়ে তিনশ মাইল দূরে তার জন্মভূমি গ্রামের উদ্দেশে হেঁটেই রওনা দেন।

রওনা দেওয়ার দ্বিতীয় দিন তারা রাজধানী থেকে অনেকটা দূরে দক্ষিণে এগিয়ে যান। পুরো পথেই তাদের আরও অভিবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে এক লাইনে হাঁটতে হয়। রাস্তায় কিছুক্ষণ পরপরই পুলিশ তাদের লাইনে হাঁটতে বাধ্য করে। ২৮ বছর বয়সী দয়ারাম চারপাশে শুধু তারই মতো মানুষ দেখতে পান। হাজার হাজার মানুষ তার মতো হাঁটছে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙে পাকিস্তানের জন্মের পর এমন মানুষের ঢল আর দেখা যায়নি। টানা চার দিন হাঁটার পর স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে নিজ গ্রামে পৌঁছান দয়ারাম। গ্রামে এমন কোনো কাজ নেই, যা করে সংসারের ভরণপোষণ করবেন তিনি। তার মতো ভারতের বহু অভিবাসী শ্রমিকের আগামীর দিনগুলো শুধুই ধূসর।

গত কয়েক দশক ধরেই ভারতের গ্রামগুলো ক্রমশ খালি হতে শুরু করে। অর্থনীতির বিকাশ না হওয়ায় একটু ভালো করে বেঁচে থাকার তাগিদে গ্রামের বাসিন্দারা ক্রমশ শহরমুখী হতে শুরু করে। কিন্তু এবারের লকডাউনের পর শহরগুলো আদতেই ফাঁকা হতে শুরু করে। বিশাল সব কারখানা ফাঁকা হয়ে গেছে ওই অভিবাসী শ্রমিকরা নিজেদের গ্রামে ফিরে যাওয়ায়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মতে, এই লকডাউন করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধের জন্য জরুরি ছিল। কারণ দেশটির ভগ্ন স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিপুলসংখ্যক করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। শহুরে অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো অভিবাসী শ্রমিকরা। দয়ারামের মতো নির্মাণশ্রমিকদের দরকার ভারতের ক্রমবর্ধমান শহরগুলোতে। অন্য শ্রমিকরা টয়লেট পরিষ্কার, ট্যাক্সি চালানো থেকে শুরু করে অন্য অনেক কাজ করে। এদের একটা বড় অংশই দিনমজুর। আগামী দিন কাজ মিলবে কি না সেই নিশ্চয়তা না নিয়েই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অল্প ভাড়ায় বাস করেন তারা। ভারত সরকারের হিসাব অনুসারে, বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলার যায় শহর থেকে গ্রামগুলোতে।