অক্সফোর্ডের করোনা ভ্যাকসিনের আদ্যোপান্ত

জানুয়ারিতে গবেষণা। এপ্রিলে প্রস্তুত। এই বৃহস্পতিবার হিউম্যান ট্রায়াল। নভেল করোনাভাইরাস থেকে বিশ্ববাসীকে বাঁচাতে ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি মাত্র চার মাসে যে ভ্যাকসিন (ChAdOx1 nCoV-19) তৈরি করেছে, তাতে সফলতা আসবে বলে ৮০ শতাংশ বিশ্বাস সংশ্লিষ্টদের।

ভ্যাকসিনটি  তৈরি হয়েছে অক্সফোর্ডের জেনার ইন্সটিটিউট থেকে। এই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী ড. সারাহ গিলবার্ট। তার নেতৃত্বে চলছে সব কিছু।  এই ভ্যাকসিন তৈরির প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় ১০টি রোগের ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়েছে অতীতে। সবগুলোই সফল।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) যে কোনো সময় এর হিউম্যান ট্রায়াল হওয়ার কথা। সেটি হয়েছে কি না, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা যায়নি। জেনার ইন্সটিটিউট তাদের ওয়েবসাইটে লিখেছে, ‘হিউম্যান ট্রায়াল একটি জটিল প্রক্রিয়া। তাই এ বিষয়ে এখনই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাংবাদিকদের যোগাযোগ না করার আহ্বান জানানো হল।’

ঠিক কখন ট্রায়াল হবে সে বিষয়ে কিছু না জানালেও এই প্রক্রিয়ার বিষয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটে বিস্তারিত জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

উদ্দেশ্য: সুস্থ মানুষকে করোনা থেকে রক্ষা করা যায় কি না, সেটি দেখা হবে এই চাডক্স১ এনকভ-১৯ (ChAdOx1 nCoV-19) ভ্যাকসিনের ট্রায়াল থেকে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে এটি রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থাকে ভালোভাবে পরিচালিত করতে পারে কি না, সেটিও জানা যাবে।

যে ভ্যাকসিন পরীক্ষা করা হচ্ছে: চাডক্স১ এনকভ-১৯ (ChAdOx1 nCoV-19) তৈরি হয়েছে চাডক্স১ (ChAdOx1) থেকে। এটি সাধারণ কোল্ড ভাইরাসের (adenovirus) দুর্বলতম ভার্সন। এই ভাইরাস শিম্পাঞ্জির ইনফেকশনের কারণ। এটি জেনেটিকালি পরিবর্তন করা হয়েছে যাতে এর পক্ষে মানবদেহে বেড়ে ওঠা অসম্ভব হয়।

চাডক্স১ তৈরি করতে যে জিনগত উপাদান যোগ করা হয়েছে, সেটি কভিড-১৯ (সার্স-কভ-২) থেকে প্রোটিন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। একে বলা হয় স্পাইক গ্লাইকোপ্রোটিন। এই প্রোটিন সার্স-কভ-২’তে দেখা গেছে। সংক্রমণের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সার্স-কভ-২ করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন ব্যবহার করে মানব কোষের এসিই২ রিসেপ্টরকে আটকে ফেলে। এরপর শরীরে সংক্রমণ ঘটায়।

গবেষকদের আশা চাডক্স১ এনকভ-১৯ ব্যবহার করে ওই স্পাইক প্রোটিনের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো যাবে।

যেভাবে হবে পরীক্ষা: পরীক্ষার প্রধান ফোকাস থাকবে কভিড-১৯ কে ঘিরে। মারাত্মক কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা না দিলে, রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা ভালো কাজ করলে এটি নির্বাচন করা হবে। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় ১১০২ জন অংশগ্রহণকারীকে নির্বাচন করা হয়েছে। তাদের চাডক্স১ এনকভ-১৯ ভ্যাকসিন অথবা নিবন্ধিত মেনএসিডব্লিউওয়াই ((MenACWY))  ভ্যাকসিন দেয়া হবে। কাকে কোনটা দেয়া হচ্ছে ট্রায়াল শেষের আগে কেউ জানতে পারবেন না।

এর মধ্যে থেকে ১০ জনকে বেছে নেয়া হবে, যারা চার সপ্তাহ পর চাডক্স১ এনকভ-১৯ ভ্যাকসিনের ২ ডোজ গ্রহণ করবেন।

প্রথম দিন দুইজন অংশগ্রহণকারীর একজনকে চাডক্স১ এনকভ-১৯ ভ্যাকসিন দেয়া হবে। আরেকজনকে দেয়া হবে নিবন্ধিত ভ্যাকসিন। নিবন্ধিত ভ্যাকসিনটি যুক্তরাজ্যের অল্প বয়সীদের অনেক আগে থেকেই দেয়া হয়। এটি চাডক্স১ এনকভ-১৯’র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও রক্ষা করে। পরীক্ষায় যারা অংশ নিচ্ছেন তাদের নতুন ভ্যাকসিনটি দেয়া হচ্ছে নাকি ওই নিবন্ধিত ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে, সেটি উদ্দেশ্যমূলকভাবেই জানানো হবে না। এটি তারা জেনে গেলে তাদের স্বাস্থ্য সচেতনতায় পরিবর্তন আসতে পারে। প্রভাবিত হতে পারে ফলাফল।

প্রথম দুজনকে ভ্যাকসিন দেয়ার পর ৪৮ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। তৃতীয়দিন একইভাবে আরও ৬ জনকে ভ্যাকসিন দেয়া হবে। পঞ্চমদিন আরেক গ্রুপকে দেয়া হবে।

ভ্যাকসিন দেয়ার পর সবাইকে একটি করে ই-ডায়েরি দেয়া হবে। পরবর্তী সাতদিনে কারো কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, সেটি সেখানে নোট করে রাখতে হবে।

কখন ফলাফল আসবে: সব ডেটা বিশ্লেষণ করতে আনুমানিক ৬ মাস লাগবে।

কাজ না করলে: নতুন ভ্যাকসিন অধিকাংশ সময় প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল দেয় না। এক্ষেত্রে সেটি হলে পুরো প্রক্রিয়া নতুন করে সাজানো হতে পারে। ডোজের মাত্রা পাল্টানো হতে পারে। অথবা প্রোগ্রামটি বন্ধ করা হতে পারে।