করোনায় দিশেহারা পৃথিবী দিনকে দিন ‘পথে’ ফিরছে। মানুষের আক্রান্তের হার বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে বাড়তে থাকলেও অনেক দেশ কভিড-১৯ রোগটিকে মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও বেশ অগ্রগতি হয়েছে।
প্লাজমা থেরাপিতে আশার আলো: যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের পর ভারত প্লাজমা চিকিৎসায় সাফল্য পেয়েছে। দেশটিতে প্রথম যে রোগীকে এই চিকিৎসা দেয়া হয়েছে, তিনি সুস্থ হয়েছেন।
আক্রান্তদের সারিয়ে তুলতে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের রক্তের প্লাজমা অসুস্থদের দেওয়ার চিকিৎসা পদ্ধতির নাম প্লাজমা থেরাপি। বাংলাদেশেও এভাবে চিকিৎসা শুরুর পরিকল্পনা চলছে।
দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে একদল চিকিৎসক এই পদ্ধতির ব্যবহার নিয়ে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছেন। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে করোনাভাইরাসের রোগীদের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ‘প্লাজমা থেরাপি’ প্রয়োগ করা হবে বলে অধিদপ্তর জানিয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এ ভাইরাস মোকাবেলা করে টিকে থাকতে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। এই অ্যান্টিবডি করোনাভাইরাসকে আক্রমণ করে। সময়ের সাথে সাথে আক্রান্ত ব্যক্তির প্লাজমায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। ওই অ্যান্টিবডিই অসুস্থদের সারিয়ে তোলার জন্য ব্যবহার হবে।
হাইপার-ইমিউন বা কোনভেলিসেন্ট প্লাজমা হলো সদ্য কভিড-১৯ আক্রান্ত-পরবর্তী সুস্থ ব্যক্তির রক্তের প্লাজমা। এই প্লাজমায় প্রচুর নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি রয়েছে। এই অ্যান্টিবডি দ্রুত কভিড-১৯ ভাইরাসকে অকার্যকর করে দিতে পারে। এজন্য কভিড-১৯ থেকে সুস্থ হওয়া ব্যক্তির রক্তের প্লাজমা অংশ সংগ্রহ করে ফ্রিজিং করে রাখতে হবে। কভিড-১৯ আক্রান্তদের মধ্যে যাদের অবস্থা খারাপের দিকে তাদের শরীরে এই প্লাজমা প্রয়োগ করা হবে।
সংক্রমণ কমানোর উপায়: এপ্রিলের শেষ দিকে এসে গবেষকেরা এই রোগের সংক্রমণ কমানোর উপায় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেরেছেন। বলা হচ্ছে হাত না ধুয়ে চোখ-মুখ স্পর্শ না করলে, বাইরে গেলে মানুষের থেকে ৩ হাত দূরে থাকলে সংক্রমণ কমে। চীন, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়ায় এভাবে সংক্রমণ কমানো সম্ভব হয়েছে।
ভ্যাকসিন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, তাদের অধীনে ৮০টির মতো প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা করছে। এর মধ্যে চীন, আমেরিকা এবং যুক্তরাজ্য ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। তারা হিউম্যান ট্রায়ালও দিয়েছে।
ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর নাগাদ তাদের ভ্যাকসিন আসতে পারে। এ বিষয়ে তারা ৮০ শতাংশ আশাবাদী।
দুদিন আগে চীনও একই কথা বলেছে। তারা জানিয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে সেপ্টেম্বরের ভেতর তাদের ভ্যাকসিন আসতে পারে। সেই ভ্যাকসিন প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকদের দেয়া হবে।
ধনকুবের বিল গেটস জানিয়েছেন, তার ফাউন্ডেশন থেকেও ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা চলছে। ১২ মাসের ভেতর তাদের ভ্যাকসিন প্রস্তুত হতে পারে।
ভ্যাকসিনের বাইরে দুটি ওষুধ নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। আমেরিকার গিলিয়াড ফার্মার রেমডিসিভিরে ৬ থেকে ১০ দিনে করোনা রোগী ভালো হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে। এই ওষুধটির বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথমে আশার কথা বললেও সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, রেমডিসিভির তেমন কাজ করেনি। পরে গিলিয়াড আবার দাবি করে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই প্রতিবেদন ঠিক নয়। প্রতিবেদনটি শেষ পর্যন্ত সরিয়ে নেয়া হয়।
আরেকটি এন্টি-ফ্লু ড্রাগ ফ্যাভিপিরাভিরও কিছু ক্ষেত্রে কাজ করছে।
টেস্টে উন্নতি: গত কয়েক সপ্তায় করোনার পরীক্ষা পদ্ধতিতে বেশ সাফল্য পাওয়া গেছে। এখন বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশ দ্রুততম সময়ে পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র যে পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে সেটি দিয়ে তারা ১৫ মিনিটে শনাক্তের দাবি করছে। গত ২৭ মার্চ থেকে আমেরিকার অ্যাবট ল্যাবরেটরিজ করছে পাঁচ মিনিটে।
সুস্থ হওয়ার সময় নির্ধারণ: গোটা বিশ্বের ডেটা বিশ্লেষণ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, প্রথম উপসর্গ দেখা দেয়ার ২ সপ্তাহের ভেতর বেশিরভাগ রোগী সুস্থ হচ্ছেন। যাদের অন্য সমস্যা আছে তাদের সুস্থ হতে ৩ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত লাগছে।
সংক্রমণ কমছে: বাংলাদেশ মঙ্গলবার ‘সর্বোচ্চ’ সংক্রমণের শিকার হলেও বেশ কয়েকটি দেশে হার কমেছে। যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, গত চার সপ্তাহ ধরে তাদের দেশে নতুন রোগীর সংখ্যা কমছে। যে হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে ভাইরাসটির উৎপত্তি, সেখানকার হাসপাতালে এখন কোনো করোনা রোগী নেই।
নিউজিল্যান্ড জানিয়েছে, তাদের দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বন্ধ হওয়ায় লকডাউন শিথিল হয়েছে। লকডাউন শিথিল করেছে ইতালিও। গত সপ্তাহে হংকংয়ে তিনদিন কোনো নতুন রোগী পাওয়া যায়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ বক্তব্য: নভেল করোনাভাইরাস মোকাবিলায় নিজেদের সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে ‘সংহতি’ বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। একই সঙ্গে ‘সবচেয়ে উপযুক্ত’ চিকিৎসা ব্যবস্থা দ্রুত বের করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ‘কোন থেরাপি দিয়ে রোগীদের দ্রুত সুস্থ করা যায়, সেটি নির্ধারণ করতে আমরা আশাবাদী।’
‘এর পাশাপাশি আমাদের একটি ভ্যাকসিন দরকার। ইবলার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে পারি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় আমরা এটি পেয়ে যাব। আমরা ঠিক সেভাবেই কাজ করছি।’