ঠিকাদারি সংস্থার মাধ্যমে জানুয়ারিতে উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের একটি মেসে রাঁধুনির কাজে যোগ দেন পশ্চিমবঙ্গের পাটরাই গ্রামের দুই বন্ধু বিশ্বজিৎ পাল ও অচিন্ত্য পাল। কিন্তু কে জানত একসময় করোনা-আতঙ্কে অজানা পথে পাড়ি দিয়ে ১২ দিন সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে!
আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, এই দুই তরুণ পাড়ি দিয়েছেন ১২শ’ কিমি পথ। সঙ্গী সাইকেল ও ‘গুগল ম্যাপ’। ১৩ এপ্রিল গাজিয়াবাদ থেকে রওনা দিয়েছিলেন দুই বন্ধু। ইন্দাস পৌঁছান ২৪ এপ্রিল।
কাজে যোগ দেওয়ার পরেই সাইকেল কিনেছিলেন তারা। অচিন্ত্য বললেন, ‘‘অজানা পথ। মোবাইলে গুগল ম্যাপ খুঁজে-খুঁজে পথ বের করি। কতবার যে কুকুরের তাড়া খেয়েছি গুনে শেষ করতে পারব না।’’
বিশ্বজিৎ বলেন, ‘‘এক মাস বেতন পেয়েছিলাম। ঠিকাদারকে বারবার ফোন করে ও যোগাযোগ করা যায়নি। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার টাকা ফুরিয়ে আসছিল। তখনই সিদ্ধান্ত নিই- সাইকেল চালিয়েই বাড়ি ফিরব। আমাদের পকেটে তখন মেরেকেটে শ’পাঁচেক টাকা।’’
দুই বন্ধু বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দেন ১৩ এপ্রিল রাতে। কিছুটা যাওয়ার পরেই তাড়া করেছিল একদল কুকুর। একটি মন্দির খোলা দেখে সেখানে ঢুকে পড়েন, খাবার জোটেনিও সেই রাতে।
বিশ্বজিৎ বলেন, ‘‘ঠিক করেছিলাম, দিনের বেলা যতটা বেশি পথ যাওয়া যায়, তা যাব। সন্ধ্যা নামলে হাইরোড ধরে সাইকেল চালানো নিরাপদ হবে না।’’ মাঝে মধ্যেই সাইকেলের চাকা ফেটেছে। কখনো টিউব ‘লিক’ হয়েছে। কখনো আবার ১৫-১৬ কিলোমিটার হাঁটতে হয়েছে সাইকেল সারানোর দোকান খুঁজে পেতে। লিক সারাতে কখনো লেগেছে ১৫০ টাকা। তবে বিহারে ঢোকার পরে কেউ কেউ অবস্থা দেখে বিনা পয়সায় ‘লিক’ সারিয়ে দেন।
‘‘সাইকেল সারাতেই অনেক টাকা গেছে। যেহেতু সাইকেলটাই একমাত্র সঙ্গী, তাই ওকে ঠিক রাখা সব থেকে বেশি প্রয়োজন ছিল। অনেক দিন অভুক্ত থেকেছি। যখন পারিনি, তখন এর-ওর দরজার কড়া নেড়েছি। কেউ যত্ন করে খাইয়েছেন। কেউ আবার তাড়িয়ে দিয়েছে,’’ থামলেন বিশ্বজিৎ।
রাতে অজানা লোক দেখে তাদের অনেক জায়গা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন স্থানীয়রা। তখন লুকিয়ে স্কুলে আশ্রয় নিতে হয়। টাকা শেষ হয়ে যায় বিহারে ঢোকার পরে। দুপুর হলে পথের ধারে হোটেলে খাবার চাইতেন তারা। কখনো বা গ্রামে ঢুকতেন খাবারের সন্ধানে।
অচিন্ত্য বলেন, ‘‘সবাই যে খাবার দিতেন তা নয়। অনেকেই তাড়িয়ে দিয়েছেন। ঝাড়খণ্ডে ঢোকার পরে চিত্রটা অনেকটাই বদলে যায়। যাদের কাছে খাবার চেয়েছি, তারাই দিয়েছেন। যাত্রাপথে বেশ কয়েকবার পুলিশ আটকেছিল। কিন্তু আমাদের কথা শুনে ছেড়ে দেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘একদিন শরীরে এমন ব্যথা হয়েছিল যে, মনে হয়েছিল, আর বোধ হয় বাড়ি ফিরতে পারব না। কিন্তু মনে জেদ ছিল। সব সয়ে গিয়েছিল। ২৪ এপ্রিল বাড়ি ফিরে মনে হয়েছিল যুদ্ধে জিতলাম। গোটা রাস্তায় দেখেছি, কত মানুষ কত রকম ভাবে লড়ছেন এই পরিস্থিতিতে।’’
গ্রামে পৌঁছনোর পর দুই তরুণকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সেলফ কোয়ারেন্টাইন পালন করেছেন অচিন্ত্য ও বিশ্বজিৎ।