গ্রায়েম হিক ৪০৫ নট আউট

গ্রায়েম হিকের টেস্ট অভিষেক হয়েছিল উইন্ডিজের বিপক্ষে ১৯৯১ সালের ৬ জুন, হেডিংলিতে। প্রথম বলটা ছিল নাক ছুঁয়ে যাওয়া ম্যালকম মার্শালের বিদ্যুৎগতির বাউন্সার। বিবিসিতে তখন কমেন্ট্রি করছিলেন রিচি বেনো। বললেন ‘গ্রায়েম হিক, ওয়েলকাম টু টেস্ট ক্রিকেট।’ পরের ইতিহাস সবার জানা। ৫১ মিনিট ব্যাটিং করে কোর্টনি ওয়ালশের বলে ৬ রানে জেফ ডুজনের হাতে ধরা পড়েছিলেন হিক। পরের ইনিংসেও করেছিলেন ৬ রান। সেই সিরিজে ১০.৭১ গড়ে ৭৫ করেছিলেন হিক। জুনে অভিষেক হয়েছিল। আগস্টে দল থেকে বাদ। ৬৫ টেস্টের ক্যারিয়ারে সিরিজ শেষে বাদ পড়া অভ্যাসের সেই শুরু।

অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। হিকের টেস্ট অভিষেকের আগের দিন ব্রিটিশ লেখক ব্রাউজ স্কট লিখেছিলেন, ‘তাকে নিয়ে এমন সজীব আর অনন্ত প্রত্যাশার মাঝে কোথাও একটা বিষাদ এসে জুড়ে বসবে না তো?’ স্কটের আশঙ্কাই সত্যি হয়েছিল। ৬৫ টেস্টে গড় মাত্র ৩১.৩২। ৬টি সেঞ্চুরি। রান ৩৩৮৩। অথচ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে গ্রায়েম হিক এক মহীরুহ। ১৩৬টা সেঞ্চুরিই করেছেন। ৫২.২৩ গড়ে রান করেছেন ৪১ হাজার ১১২। কাউন্টিতে হিকের চেয়ে বেশি রান আছে মাত্র সাতজনের। সেই সাতজনের মধ্যে আছেন জ্যাক হবস এবং ওয়ালি হ্যামন্ডের মতো কিংবদন্তিরা। লেন হটন, ডব্লিউ জি গ্রেস এবং ডেনিস কম্পটনরা সেঞ্চুরি সংখ্যায় পিছিয়ে আছেন হিকের চেয়ে। টেস্ট ক্রিকেটে তার ব্যর্থতা নিয়ে গার্ডিয়ানের কলামনিস্ট সিমোন হ্যাটেনস্টোন লিখেছিলেন, ‘গ্রায়েম হিকের মতো স্পোর্টসম্যান আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি। কেবল তার আবেগ, বৈচিত্র্য কিংবা উৎসাহের কারণে নয়; হিক আসলে চূড়ান্ত এক বিভ্রমের নাম। ক্রিকেটের গ্রেট প্যারাডক্স।’

১৯৬৬ সালের ২৩ মে হারারেতে জন্ম তার। তখন অবশ্য শহরটার নাম ছিল সালসবুরি। পরে নাম বদলে করা হয় হারারে। ১৯৮৪ সালে ইংল্যান্ডে যাওয়ার সময় হিকের বয়স ১৮ হয়নি। সেই বয়সেই কাউন্টিতে হাজার রানের রেকর্ড গড়েন। ওস্টারশায়ারের হয়ে এরপর এত বেশি রেকর্ড গড়েছেন যে, হিসাবের জন্য কাউন্টিতে আলাদা একটা অধ্যায় যুক্ত করতে হয়েছে। অল্প বয়সে এক মৌসুমে দুই হাজার রানের রেকর্ড তার। কম বয়সে ৫০ সেঞ্চুরিও করেছেন তিনি। আর সবশেষে কম বয়সে কাউন্টিতে করেছেন সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি রেকর্ডও।

৪০৫ রানের ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ ইনিংসটা খেলেছিলেন হিক ১৯৮৮ সালের ৬ মে, অর্থাৎ আজকের দিনে। সমারসেটের সঙ্গে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচ। চার দিনের ম্যাচটা শুরু হয় আগের দিন। আগে ব্যাট করছিল ওস্টারশায়ার। ওপেনার টিম কার্টিস ২৭ রানে আউট হওয়ার পর নামেন হিক। প্রথম দিন শেষে ১৭৯ রানে অপরাজিত ছিলেন। দ্বিতীয় দিন দুশো, তিনশো পেরিয়ে চারশো রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। ৫৫৫ মিনিট ব্যাট করেছিলেন হিক। খেলেছিলেন ৪৬৯ বল। ৩৫ বাউন্ডারি আর ১১ ছক্কায় ৪০৫ রানে অপরাজিত ছিলেন। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে হানিফ মোহাম্মদের ৪৯৯ রানের রেকর্ড ভাঙার প্রবল সম্ভাবনার মুখে হিককে থামিয়ে ইনিংস ঘোষণা করেন অধিনায়ক ফিল নেল। ফলে আর্চি ম্যাকলারেনের ৪২৪ রানের রেকর্ডও টিকে যায়।

হিকের পরে সেই ম্যাচে সর্বোচ্চ স্কোর ছিল ৫৬, যা করেছিলেন স্টিভ রোডস (বাংলাদেশের সাবেক কোচ) । প্রতিপক্ষ সমারসেট দলে মার্টিন ক্রো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছেন ২১ বছরের তরুণের অসাধারণ সেই ইনিংস। ৫২৬ ম্যাচের ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ারটা শেষ হয় ২০০৮ সালে। ইংল্যান্ড দলে কখনো নিয়মিত হতে পারেননি হিক। ক্রিকেটপন্ডিতরা মনে করেন বাজে ব্যবস্থাপনার কারণেই ধ্বংস হয়েছিল হিকের প্রতিভা। তার কাঁধে টিম ম্যানেজমেন্ট সহানুভূতির হাত রাখলে হিকের টেস্ট গড়ও পঞ্চাশের ওপর যেতে পারত। রে ইলিংওয়ার্থের মতো মানুষও ‘ক্রাইং বেবি’ বলে তাচ্ছিল্য করেছেন হিককে। ১৯৯৪-৯৫-এর অ্যাশেজ ট্যুরের সময় সিডনি টেস্টে হিক যখন ৯৮ রানে ব্যাট করছিলেন তখন ইনিংস ঘোষণা করেন মাইক আথারটন। অভিযোগ ছিল হিক মন্থর ব্যাটিং করেছিলেন। অপমান ভোলেননি। পরে বলেছিলেন, ‘আথার্স আমার ভালো বন্ধু। তবে ড্রেসিংরুম থেকে সেই সংকেতটা মেনে নিতে পারিনি।’

টেস্টে বারবার সুযোগ পেয়েও নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি হিক। মাথা নিচু করে ওস্টারশায়ারে ফিরে শয়ে শয়ে রান করেছেন, যা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন প্রতিপক্ষরা। শেন ওয়ার্ন বলেছেন, ‘জাত ক্রিকেটার।’ স্টিভ ওয়াহ বলেছেন, ‘বাইরে থেকে ইংল্যান্ডে আসা সেরা প্রতিভা।’ টেস্ট ক্যারিয়ারেও কি এমন প্রশংসায় ভিজতে পারতেন না হিক? মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। কিন্তু উত্তর মিলবে না। কী করে মিলবে? ক্রিকেট পারাডক্সের উত্তর কি সহজে মেলানো যায়? হিক তো আর গ্রেস কিংবা গাওয়ার নন। যাকে স্টাইল দেখেই চিনে ফেলা যাবে। জিম্বাবুয়ের কৃষক সন্তান হিক শ্রম আর ধৈর্যের প্রতিমূর্তি। যেখানে থ্রিল নেই। ভিভ রিচার্ডসের মতো বিস্ফোরণ নেই। আছে কেবল নিরন্তর সংগ্রাম।