করোনা মোকাবিলায় সম্মুখযুদ্ধে চাঁদপুরের চিকিৎসক দম্পতি

মহামারী করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চাঁদপুরে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এক চিকিৎসক দম্পতি। একমাত্র সন্তান আর পরিবারের সদস্যদের কথা চিন্তা না করে সাধারণ মানুষের সেবায় কাটছে তাদের অধিকাংশ সময়।

এই দম্পতি হলেন ডা. সুজাউদ্দৌলা রুবেল ও ডা. সাজেদা বেগম পলিন। ভয়কে জয় করে করোনাযুদ্ধে সম্মুখভাগে থেকে কাজ করছেন তারা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নির্ভয়ে কাজ করে মানবতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন এই চিকিৎসক দম্পতি।

চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন ডা. সাজেদা বেগম পলিন।

তার স্বামী ডা. সুজাউদ্দৌলা রুবেল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) হিসেবে কর্মরত আছেন। একইসঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডা. রুবেলকে করোনা বিষয়ক ফোকাল পারসন ও মেডিকেল টিমের প্রধান হিসেবে মনোনীত করেন।

ইতোমধ্যে গত ৬ মে চট্টগ্রাম বিভাগের ১৪ জন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে করোনাযুদ্ধের ‘জেনারেল’ উপাধি দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ডা. সাজেদা বেগম পলিন অন্যতম।

আইইডিসিআর’র করোনা বিষয়ক প্রশিক্ষণেও চাঁদপুর জেলা থেকে শুধুমামত্র এই চিকিৎসক দম্পতি অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। এরপর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আরও কয়েক দফা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তারা।

প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি, পদ্ধতি, সাহসিকতা পুরোটাই মেলে ধরেছেন করোনা আক্রান্ত মানুষের সেবায়।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী চাঁদপুর জেলায় করোনা রোগীদের সেবায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ২৪৭ জন চিকিৎসক কাজ করে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে রুবেল-পলিন দম্পতি তাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইতোমধ্যে মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছেন বেশ। করোনা সংকটের শুরু থেকেই নিজেদের উজাড় করে দিয়ে কাজ করছেন তারা।

ডা. রুবেল বলেন, প্রতিনিয়তই কাজের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে আমাদের। ঝুঁকি আছে জেনেও আমার স্বাভাবিক কাজের পাশাপাশি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা করোনা সন্দেহভাজন রোগীদের চিহ্নিত করে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করি।

রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসাপত্র দেওয়া, শনাক্ত রোগীদের আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা অথবা বাসায় চিকিৎসাপত্র দেওয়া, আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রোগীদের বাড়তি নজর রাখাসহ মৃত ব্যক্তির ময়নাতদন্তের কাজ করতে হয়। এর পাশাপাশি সংবাদকর্মীদেরও তথ্য দিতে হয় প্রতিনিয়ত।

এতে করে অনেক সময় শরীর-মন আর কথা শুনতে চায় না। কিন্তু পরক্ষণেই অসহায় মানুষের মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠলে নিজেকে কাজের জন্য প্রস্তুত করে নেই। এই কাজে আমাদের সাহস যোগায় আমাদের একমাত্র সন্তান মুফতাদি আরাবী। বাসায় গেলে নিজের কষ্টের কথা বুঝতে না দিয়ে আমাদেরকে অনেক উৎসাহ দেয়।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আমরা দুইজন এই কাজ করে যাচ্ছি। চিকিৎসকের কাজই হলো মানুষকে সেবা দেওয়া। কিন্তু এই কঠিন সময়ে চাকরির ঊর্ধ্বে ওঠে আমরা কাজ করছি। দেশের প্রয়োজনে, মানুষের প্রয়োজনে আমরা নিজেদের কাজে লাগাতে পারছি এইতে অনেক খুশি। মাঝে মধ্যে ক্লান্তি ভর করে শরীরে, কিন্তু থেমে পড়লে তো হবে না। নিজেদের করোনাযোদ্ধা মনে করে আবার এগিয়ে যাই।

তিনি বলেন, মানুষ হয়ে জন্মেছি মরণ একদিন হবেই। করোনা রোগীদের সেবা দিয়ে গিয়ে যদি মৃত্যু হয় এতে কোন দুঃখবোধ থাকবে না আমার।

ডা. সাজেদা বেগম বলেন, আমার কর্মস্থলে কোনো হাসপাতাল না থাকায় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে, করোনায় আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বিশেষ ব্যবস্থায় দাফন করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বাড়ি বাড়ি টিম পাঠিয়ে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করার কাজটি করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “কভিড-১৯ হেল্পলাইন” নামে একটি ফেইসবুক পেজে প্রতিদিন ভিডিও লাইভের মাধ্যমে করোনা বিষয়ে তথ্য, পরামর্শ, চিকিৎসা ও সতর্কতা তুলে ধরছি। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা মানুষের বিভিন্ন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিচ্ছেন।

‘এছাড়া ২৪ ঘণ্টা মুঠোফোনের মাধ্যমে করোনাবিষয়ক টেলিমেডিসিন সেবা দিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, রুবেল-পলিন চিকিৎসক দম্পতি চাঁদপুরের মডেলে পরিণত হয়েছেন। শহরে আলাদা দুই প্রতিষ্ঠানে থেকেও করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবা, নমুনা সংগ্রহ ও সচেতনতায় শুরু থেকে সক্রিয় রয়েছেন।

ইতোমধ্যে ডা. সাজেদা বেগমকে স্বাস্থ্য বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক করোনাযুদ্ধের ‘জেনারেল’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন।

তিনি বলেন, এই চিকিৎসক দম্পতির কাজ দেখে অন্যান্য চিকিৎসকরাও অনুপ্রাণিত হয় করোনা মোকাবেলায়। করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া থেকে শুরু করে মৃতদের যথাযথ নিয়ম মেনে দাফন কার্যে এগিয়ে আসছেন। মানব সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করেছেন এই দম্পত্তি। আশা করি তাদের এই আত্মত্যাগ বিফলে যাবে না।