যৌতুক দাবি-নির্যাতন ও ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা

যৌতুক দাবি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে দৈনিক যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার রেজাউল করিম প্লাবনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন দৈনিক সমকালের নারী সাংবাদিক পারুল আক্তার ওরফে সানজিদা পারুল।

সোমবার হাতিরঝিল থানায় করা মামলায় প্লাবনসহ তার দুই ভাই এম এ আজিজ ও নিজাম উদ্দিন এবং মা-বাবাকেও আসামি করা হয়েছে।  

এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, দৈনিক যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার প্লাবনের বাবার নাম সামছুল হক। গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার পাত্রখাতা রহমান হাজীর গ্রামে। বর্তমানে প্লাবনের বাসা হাতিরঝিল থানাধীন মীরবাগের কসমোপলিটন হালিম নিবাসে।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে হাতিরঝিল থানার ওসি আবদুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, যৌতুক দাবি, নির্যাতন ও ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে প্লাবনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এজাহারে বলা হয়েছে, একই পেশায় থাকায় প্লাবনের সঙ্গে বাদী পারুলের দীর্ঘ দিনের পরিচয়। মাঝেমধ্যেই তাদের কথা হতো। এক পর্যায়ে ঘনিষ্ঠতা এবং প্রেমের সম্পর্ক হয়। পরে তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। গত ২ এপ্রিল খিলক্ষেত থানার বটতলা এলাকায় প্লাবনের বন্ধুর বাড়িতে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের কাবিন করেন এমএমআরও কাজী অফিসের কাজী।

বিয়ের পর নবদম্পতি সংসার শুরু করেন প্লাবনের মীরবাগের বাসায়। বিয়ের পর প্লাবন গ্রামের বাড়িতে নেননি তার স্ত্রী পারুলকে। শ্বশুর বাড়ি কুড়িগ্রামে যেতে চাইলে প্লাবন যৌতুক হিসেবে একটি ফ্ল্যাট অথবা নগদ ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। যৌতুক হিসেবে এত টাকা পারুলের বাবা-মা দিতে পারবেন না বলে জানান।

এজাহারে আরও বলা হয়, যৌতুক না দেওয়ায় পারুলের ওপর নেমে আসে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। প্লাবন প্রায়ই তাকে (পারুল) বেধড়ক পেটাত। পারুল জানতে পারেন একাধিক নারীর সঙ্গে প্লাবনের বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল এবং এখনও আছে। তিনি স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। এতে নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। সামাজিক মান মর্যাদার ভয়ে অনেকদিন যাবৎ সব নীরবে সহ্য করেন পারুল।

এ অবস্থায় গত ২৯ এপ্রিল রাত ১০ টায় প্লাবন স্ত্রীকে জানান, জরুরি কাজে তাকে গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামে যেতে হবে, তার মা গুরুতর অসুস্থ। শাশুড়ির অসুস্থতার খবর শুনে পারুলও যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু প্লাবন তাকে গ্রামে নিয়ে যেতে রাজি হননি। এ নিয়ে তর্কের এক পর্যায়ে পারুলকে বেধড়ক মারধর শুরু করেন প্লাবন। পারুল হাতে-পায়ে ধরে অনুরোধ করেন মারধর না করতে।

এসময় প্রেগনেন্সি পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে জানিয়ে এভাবে মারধর করলে সন্তানের ক্ষতি হতে পারে জানালে প্লাবন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং মারতে থাকেন। এক পর্যায়ে তার তল পেটেও আঘাত করেন। পরদিন সকালে পারুলকে বাসায় রেখে প্লাবন গ্রামের বাড়ি চলে যান। পরে গর্ভাবস্থায় নারীদের যেসব সমস্যা হয়, সেই সমস্যার কথা ফোনে স্বামীকে জানান। তিনি এসব কথা শুনতে চাননি। তাকে জানান, মায়ের অসুস্থতার কারণে আপাতত ঢাকায় আসতে পারবেন।

অসুস্থ শাশুড়ির দেখার জন্য ৫ মে বিকেলে অ্যাম্বুলেন্স যোগে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় শ্বশুর বাড়ি যান পারুল। শ্বশুরবাড়ির সামনে গিয়ে ডাকাডাকি করেও প্লাবনের সাড়া পাননি। এ সময় প্লাবনের বড় ভাই এম এ আজিজ ও ছোট ভাই এস এম নিজাম উদ্দিন, বাবা ও মা বেরিয়ে আসেন। তারা পারুলকে পুত্রবধূ হিসাবে অস্বীকার এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।

এক পর্যায়ে শাশুড়ি পারুলের ওপর মারমুখী হয়ে ওঠেন। পারুলকে তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, তার ছেলে যৌতুক হিসেবে যা চেয়েছে তা পূরণ করতে পারলে এই বাড়িতে তার স্থান হবে। শাশুড়ির ভূমিকা দেখে পারুল বুঝতে পারেন অসুস্থতার কথা মিথ্যা বলেছেন প্লাবন। প্লাবনের দুই ভাইও ঢাকায় প্লাবনকে একটি ফ্ল্যাট কিনে দেয়ার কথা বলেন পারুলকে। যৌতুকের দাবি মেটাতে অস্বীকৃতি জানালে সবাই মিলে পারুলকে চড়থাপ্পড় ও চুল ধরে টানা-হিঁচড়া করেন। এ পরিস্থিতিতে পারুলের সঙ্গে থাকা স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক তাকে উদ্ধার করে চিলমারী  উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয় তাকে।

মারধরের ঘটনায় চিলমারী থানায় মামলা করতে যান পারুল। কিন্তু যেহেতু তাদের বিয়ে হয়েছে ঢাকায়, সংসারও ঢাকায়, তাই ঢাকায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করার পরামর্শ দেন থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্যরা। পরে ওই অবস্থায় ঢাকায় ফিরে আসেন পারুল।

পারুল এজাহারে উল্লেখ করেন, প্লাবন ও তার পরিবারের সদস্যদের মারধরের কারণে তার গর্ভের ভ্রূণটি নষ্ট হয়ে গেছে।

ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে সাজিদা ইসলাম পারুল বলেন, তার ওপর অমানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেজাউল করিম প্লাবন মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলা হয়েছে এতে আমার করার কি আছে। পারুল যেসব অভিযোগ এনেছে তার সবই মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আমি এ বিষয়ে আইনজীবীর সঙ্গে আলাপ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।