১৩ মে ১৯৮৪। এই দিনেই পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছিলেন ইয়োহান ক্রুইফ। গোলও করেছিলেন সেদিন। বিদায়ী ম্যাচে সতীর্থের কাঁধে ক্রুইফের ছবি দেখে খটকা লাগে। ফ্লাইং ডাচম্যানের গায়ে ফেইনুর্ডের জার্সি। আয়াক্সের নয় কেন? এই প্রশ্নটাই অন্য একটা অধ্যায়ের সামনে দাঁড় করায়।
ক্রুইফের জীবন সাফল্যে ভরপুর। অপ্রাপ্তিও কম নেই। ১৯৭৪’র কালজয়ী দল নিয়েও বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। এটা না হয় মেনে নেওয়া গেল। নিজের দল আয়াক্স আমস্টারডম থেকে অপমানজনক বিদায়কে মেনে নেবেন কীভাবে? দলের সতীর্থরা ১৯৮৩ সালে ক্রুইফের হাত থেকে অধিনায়কত্ব নিয়ে নেওয়ার দাবিতে বিদ্রোহ করেছিলেন। সফলও হয়েছিলেন। ফলে আয়াক্সকে তিনবার ইউরোপ-সেরার শিরোপা এনে দেওয়া ক্রুইফকে বিদায় নিতে হয়। আয়াক্স কর্র্তৃপক্ষ কেবল অধিনায়কত্ব কেড়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, চুক্তি নবায়নেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ফলে বাধ্য হয়ে আয়াক্সের শত্রু ক্লাব ফেইনুর্ডে যোগ দেন ক্রুইফ। ১৯৮৩-৮৪ মৌসুমে ডাবল জিতে ‘প্রতিশোধও’ নিয়েছিলেন।
ক্রুইফের বয়স তখন ৩৬। আয়াক্সে তার দ্বিতীয় পর্যায় চলছে। ১৯৮৩’র গ্রীষ্মে লিগ জিতিয়েছেন। ঘরে তুলেছেন ক্লাব কাপও। কোথায় সম্মান পাবেন, নতুন চুক্তি করা হবে, তা নয় উল্টে ‘অর্থ পিশাচের’ অপবাদ দিয়ে অসম্মানিত করা হলো। ক্রুইফের মতো প্রতিভার পক্ষে অপমান মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। যোগ দিলেন আয়াক্সের চিরশত্রু ফেইনুর্ডে। শেষ বয়সেও ঝলমল করে উঠল তার বিশ্বস্ত দুটি পা।
সেই দলবদল ডাচ ফুটবলে আলোড়ন তুলেছিল। আয়াক্সের সমর্থকরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল। অর্ধেক তো ক্লাবকে সমর্থন করাটাই ছেড়ে দেয়। অন্যদিকে ক্রুইফকে পেয়ে স্বাভাবিক ভাবেই আপ্লুত ছিল ফেইনুর্ডের সমর্থকরা। সেই মৌসুমে ফেইনুর্ড প্রথম ছয় ম্যাচের পাঁচটি জিতেছিল। টানা ১৫ ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ডও গড়ে। যার মধ্যে জয় ছিল ১২টিতে। কেএনভিবি কাপের নকআউট পর্বে ফেইনুর্ড বিদায় করেছিল আয়াক্সকে। লিগের ম্যাচেও আয়াক্সকে হারিয়েছিল তারা ৪-১ গোলে। ফেইনুর্ডে সতীর্থ হিসেবে ক্রুইফ পেয়েছিলেন তরুণ রুদ খুলিতকে। আয়াক্সের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ফেইনুর্ডের হয়ে দুজনেই গোল করেন। লিগে শেষ ১১ ম্যাচের ৮টিতেই জিতেছিল ফেইনুর্ড। তিনটি ড্র হয়। আর্টরেখকে ৩-০ গোলে হারিয়ে লিগ জয় নিশ্চিত করায় সময় দুটি ম্যাচ বাকি ছিল। একই রকম প্রতাপ নিয়ে সে বছর কেএনভিবি কাপও জেতে ফেইনুর্ড। ১৯৮৪ সালের ১৩ মে ক্রুইফ প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে শেষ ম্যাচটি খেলেছিলেন জোলের বিপক্ষে। গোলও পেয়েছিলেন। এরপরেই পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানান ফ্লাইং ডাচম্যান।
১৯৬৫ সালে আয়াক্সের কোচ হয়ে এসেছিলেন রাইনাস মিশেলস। হাতে পেয়েছিলেন তরুণ ক্রুইফকে। এ দু’জনের যুগলবন্দিতেই উদ্ভব হয়েছিল প্রেসিং ফুটবলের সৃষ্টিশীলতা। গোটা দুনিয়া যাকে ‘টোটাল ফুটবল’ নামে চেনে। কোনো এক সাংবাদিক দিয়েছিলেন নামটা। রাইনাস মিশেলস নতুন ধরনের খেলাকে প্রেসিং ফুটবলই বলতেন। কী সেটা? বলতে পারেন একটা মুভ। গোলকিপারের কাছ থেকে গড়ানো বল যাচ্ছে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের কাছে। তারা বাড়িয়ে দিচ্ছেন উইঙ্গারের দিকে। এরপর মাঝমাঠে ছোট ছোট পাস খেলে তৈরি হচ্ছে আক্রমণ। নিখুঁত টাচে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে ডি বক্সে ঢুকে পড়ছেন কেউ। বলের দখল হারালে সেখান থেকেই কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা। সার্বিকভাবে এই সিস্টেমে গতিময় ওঠা-নামায় সব সময় খেলে যাওয়া। ক্রুইফ বলতেন, ‘টেকনিক মানে হাজার বার বল জাগলিং নয়। তা হলে তো সার্কাসেই কাজ করা যায়। টেকনিক মানে বলটাকে একটা টাচে সঠিক গতিতে নিখুঁত নিশানায় সতীর্থের কাছে পাঠানো।’ তার নেতৃত্বে নেদারল্যান্ডস দল এই কাজটাই বারবার করে দেখিয়েছে।
‘ওয়ার্ল্ড সকার’ ম্যাগাজিন একবার ফুটবল ইতিহাসের সেরা কুড়ি দল বেছে নিয়েছিল। যার মধ্যে ফুটবলার ও কোচ ক্রুইফের ছিল তিনটি দল। ১৯৭৪-এর নেদারল্যান্ডস, ১৯৭১-৭৩ আয়াক্স আমস্টারডম ও বার্সেলোনার স্বপ্নের দল। যা কিছু সৃষ্টিশীলতা সেই দলগুলো দেখিয়েছিল এখনকার ফুটবলে তা বারবার রিপিট হয়। এ কারণেই আধুনিক ফুটবলের জনক বলা হয় ক্রুইফকে। ১৯৭০ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তো বলেছিলেন, ‘আমরা যে ফুটবলটা খেলতাম তার সঙ্গে এখনকার ফুটবলের তফাৎ উনিশ-বিশ। কেবল আলাদা চুয়াত্তরে ক্রুইফদের নেদারল্যান্ডস টিমটা। কী অদ্ভুত সৌন্দর্য! ফুটবলের টেনশন কোথায় সেখানে? যেন মাঠের মধ্যে মেরি গো রাউন্ড চলছে। আর তার চালক ক্রুইফ।’ রাইনাস মিশেলস ক্রুইফকে ছাড়া টিম তৈরির কথা কল্পনাও করতে পারতেন না। ফ্রান্সের আরেক ফুটবল প্রতিভূ এরিখ ক্যান্টোনা বলতেন, ‘ক্রুইফ চাইলে মাঠে যে কোনো পজিশনে সেরা ফুটবলার হতে পারতেন।’ এ কারণেই ‘টোটাল ফুটবল’ তার পায়ে ফুল হয়ে ফুটেছিল। অমরতাও দিয়েছিল।
আর তিনি, ইয়োহন ক্রুইফ, গোটা ফুটবল দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি বোধহয় অমর থেকে যাব।’