বাড়ির বাইরে গেলেই করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার শঙ্কা, আর ঘরের মধ্যে থাকলে মশার উৎপাতে টিকে থাকা কষ্টসাধ্য। খুলনা মহানগরীতে এখন করোনা আতঙ্কের পাশাপাশি অন্যতম বড় সমস্যা মশা। বৃষ্টির মৌসুম শুরু হওয়ায় বেড়েছে মশার উৎপাত। বর্ষার আগেই মশা বেড়ে যাওয়ায় নগরবাসীকে তাড়া করছে গত মৌসুমের ডেঙ্গুর ভয়। দিনের আলো কমে গেলে ঘরে-বাইরে মশার গুনগুন শব্দ বেড়ে যায়। রাস্তা কিংবা বাড়ির ছাদে দাঁড়ালেই মাথার ওপর মশার জটলা দেখা যাচ্ছে। এদিকে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের কর্মীদেরও দেখা পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। শিগগিরই মশা নিধনের উদ্যোগ না নিলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে এমনটাই মনে করছে নগরবাসী।
খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) কঞ্জারভেন্সি শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের বসবাস। করোনাকালে মহানগরীসহ আশপাশের এলাকায় মশার উপদ্রব ভয়ানকভাবে বেড়েছে। মশা নিধনে ৩৫ জন স্প্রেম্যান এবং ড্রেন পরিষ্কার করার জন্য ২০০ লোক কাজ করলেও তার সুফল মিলছে না। বিশেষ করে নর্দমার সংস্কারসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ থাকায় সড়ক ও অলিগলিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। যেখানে জন্ম নিচ্ছে মশা। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়াসহ নানা ধরনের মশাবাহিত রোগ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মশা নিধনে ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে কেসিসি। যার মধ্যে ২ কোটি টাকা খরচ করে ১০টি ফগার ও ৩০টি হ্যান্ড স্প্রে মেশিন, লার্ভিসাইড, অ্যাডাল্টিসাইড ও ওষুধ কেনা হয়েছে। এসব ব্যবহার করে দুটি ধাপে কার্যক্রম পরিচালনা করছে কেসিসি। গত ৭ বছরে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে মশা নিধনে। বর্তমানে ওষুধেরও সংকট নেই। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, করোনা পরিস্থিতির কারণে কেসিসির উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থমকে গেছে। আংশিক শেষ হওয়া এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দ্রুত শেষ না হওয়ায় ড্রেনেজ-ব্যবস্থা অনেকটা অচল হয়ে পড়েছে। ফলে নগরীতে ব্যাপকভাবে মশার প্রকোপ বেড়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এবার বর্ষা মৌসুমে নগরীতে স্থায়ী জলাবদ্ধতাও দেখা দিতে পারে।
নগরীর নিরালা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা বিপুল দে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে মশার উৎপাত এতটাই বেড়েছে যে, ঘরে থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। ঘরে মশার কয়েল জ্বালিয়েও নিস্তার পাচ্ছি না। মশার কারণে রাতে ঘুম হারাম হওয়ার অবস্থা।’
টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা আবদুল হাই বলেন, ‘ড্রেনগুলো ময়লার ভাগাড় হয়েছে। তাতে জমছে বৃষ্টির পানি। সেখানে মশা তৈরির ফ্যাক্টরি হয়েছে। বাইরে গেলে করোনার ভয় আর ঘরে মশার ভয়। এখন আমরা কোথায় যাব।’
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘নগরীর অধিকাংশ ড্রেন অপরিষ্কার ও পানি জমছে। সেই উৎপত্তির স্থলে সঠিকভাবে ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে মশা দিন দিন বাড়ছে। অসহনীয় হয়ে উঠেছে মশার উৎপাত। মশক নিধন কার্যক্রম তেমন একটা চোখে পড়ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে ডেঙ্গুসহ অন্যান্য মশাবাহিত রোগ বড় বিপদ ডেকে আনবে।’ খুলনা জেলার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ বলছেন, ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে তাদের প্রস্তুতি রয়েছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমাদের হাতে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটও এসেছে। উপজেলা পর্যায়ে সেগুলো দেওয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশনসহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনই নগর পরিচ্ছন্নতা ও মশা নিধনে কার্যকর ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও দ্রুত শেষ করতে হবে। কোথাও স্বচ্ছ পানি জমতে দেওয়া যাবে না।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কেসিসির প্রধান কঞ্জারভেন্সি কর্মকর্তা আবদুল আজিজ বলেন, ‘নতুন ফগার মেশিন কেনা হয়েছে। নতুন করে লার্ভিসাইট ও অ্যাডাল্টিসাইড কেনা হচ্ছে। তা ছাড়া মশক নিধনে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে নগরবাসীর সহযোগিতা এ ক্ষেত্রে খুব প্রয়োজন। তাদের নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা ও বাড়ির আঙ্গিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।’
অন্যদিকে সিটি মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মশা নিধনে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। নগরবাসীকে এ জন্য কেসিসিকে সহযোগিতা করতে হবে।