করোনা পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী সরকারি ছুটি শুরুর পর প্রথমদিকে কলকারখানা বন্ধ থাকায় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দূষণ অনেকটাই কমেছিল। পানির মানও ছিল জলজ প্রাণীর অনুকূলে। কিন্তু কর্ণফুলীর দূষণ সেই আগের রূপ নিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে নদীটি। বিপন্ন হয়ে উঠছে নদীর বাস্তুসংস্থান ও নানা প্রজাতির মাছ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূষণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে কর্ণফুলী। নদীটি বাঁচাতে শিগগিরই সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
কর্ণফুলীর সঙ্গে সংযুক্ত নগরীর ফিরিঙ্গীবাজার থেকে চাক্তাই খাল, রাজাখালী খাল ও বোয়ালখালী খাল। গত সোমবার এবং গতকাল মঙ্গলবার এসব এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এ খালগুলো দিয়ে আবারও বিষাক্ত রাসায়নিক ও বর্জ্য কর্ণফুলীতে গিয়ে মিশছে। এর সঙ্গে রয়েছে পলিথিন, প্লাস্টিক এবং নানা অপচনশীল সামগ্রী। চাক্তাই এলাকায় খালের পানি বেয়ে কালো রঙের তেল গিয়ে পড়ছে নদীতে। শাহ আমানত সেতু হতে মইজ্জ্যারটেক এলাকায় খাল থেকে গৃহস্থালি এবং পয়ঃবর্জ্য মিশ্রিত কালো পানিও যাচ্ছে নদীতে। ছোট বোট এবং স্থানীয় এলাকায় পণ্যপরিবহনের জন্য চাক্তাই-চামড়া গুদাম এলাকার খালে চলাচলকারী নৌযানগুলোর পোড়া তেলেও দূষিত হচ্ছে নদী। কর্ণফুলীর সঙ্গে যুক্ত খালগুলোও চরম দূষণের শিকার।
কর্ণফুলীর দুই পাড়ে তিনশোর মতো কলকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম), রেয়ন মিলস, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল), কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো), টিএসপি, তেল পরিশোধন প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার তেলের ডিপো, চিটাগাং ড্রাইডক ও সিমেন্ট কারখানাগুলো মারাত্মক দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত পরিবেশ অধিদপ্তরের তালিকায়। অতীতে এর মধ্যে কয়েকটিতে অভিযান চালিয়ে একাধিকবার জরিমানাও করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এসব কারখানার প্রায় ৬২ ধরনের মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে মিশছে। শিল্পকারখানায় ইটিপি চালু না রাখার কারণেই এ দূষণ। পাশাপাশি চট্টগ্রাম নগরীতে ৮৪টি তরল বর্জ্য নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠান বা কলকারখানা আছে। এদের মধ্যে ২০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) নেই। অতীতে বেশিরভাগ সময় পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযানে গিয়ে ইটিপি থাকার পরও কারখানাগুলোতে তা বন্ধ দেখতে পেয়েছে। এজন্য জরিমানাও করা হয়।
দখল আর দূষণে বিপর্যস্ত কর্ণফুলী নদীতে প্রতিদিন নগরীর পাঁচ হাজার টন পয়ঃ ও গৃহস্থালি বর্জ্য পড়ছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে শিল্প ও চিকিৎসা বর্জ্য। তবে দেশে করোনার প্রার্দুভাব শুরুর পর গত মার্চ মাস থেকে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত কলকারখানা বন্ধ থাকায় কর্ণফুলীর দূষণ অনেকটাই কম ছিল। এখন দুই পাড়ের সব কারখানা আবার চালু হওয়ায় দূষণও আগের রূপ নিয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে চারটি সরকারি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম ওয়াসা, সিইউএফএল ও কেপিএম সবচেয়ে বেশি কর্ণফুলীকে দূষিত করছে। ফলে অভিযানেও কাজের কাজ কিছু হয় না কর্ণফুলী রক্ষায়।
পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা শরীফ চৌহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যখন লকডাউনের কারণে দেশের সব জায়গায় নদ-নদী ও পরিবেশ দূষণ কমছে এমন সময়েও কর্ণফুলী দূষণ থেমে নেই। জাহাজ চলাচল না থাকায় দূষিত তেল দ্বারা দূষণ কিছুটা কমেছে। কিন্তু শিল্পবর্জ্যে নদীর দূষণ ক্রমাগত চলছে। যাদের এসব দেখার কথা তারা নির্বিকার। দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা কর্ণফুলীকে দূষণমুক্ত রাখাটা শুধু পরিবেশের জন্য নয়, সবদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কর্ণফুলীর প্রতি সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান খরচ কমাতে ইটিপি বন্ধ রেখেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তদারকি বন্ধ, তাই এখন বর্জ্য নিঃসরণকারী যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি রয়েছে তারা সেটা পুরোপুরি কার্যকর না রেখে সরাসরি বর্জ্য নদীতে ফেলছে।’