করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকারি সিদ্ধান্তে ঘুরছে না গাড়ির চাকা। এ পরিস্থিতিতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন খুলনার প্রায় ৯ হাজার পরিবহনশ্রমিক। গাড়ির চাকার মতো অভাব-অনটনে পড়ে তাদের সংসারের চাকাও যেন থমকে যেতে বসেছে। আর ঈদের আগে এসব পরিবহনশ্রমিকের পরিবারে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্যসংকট। অসহায় হয়ে পড়া শ্রমিক পরিবারগুলোর পাশে নেই শ্রমিক সংগঠন ও নেতারাও। শ্রমিকদের অভিযোগ, আপৎকালীন শ্রমিকদের সহযোগিতা ও সংগঠনের নাম করে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে কর্মহীন হয়ে পড়া গণপরিবহনের এসব শ্রমিককে এখন সেই চাঁদার টাকা থেকে কোনো প্রকার সহযোগিতা করা হচ্ছে না। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না নেতাদেরও। অবশ্য কিছু শ্রমিক নেতা নামমাত্র সামান্য ত্রাণ দিয়েই সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেছেন বলেও শ্রমিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
পরিবহনশ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনা পরিস্থিতিতে গত ২৬ মার্চ থেকে খুলনায় বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকেই কর্মহীন রয়েছে জেলা ও মহানগরের প্রায় ৯ হাজার পরিবহনশ্রমিক। খুলনার আন্তঃজেলার ১৮টি রুটে সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ৩০০-৪০০ বাস চলাচল করত। এই রুটগুলো থেকে প্রতিদিন মালিক সমিতির নামে প্রায় পৌনে দুই লাখ টাকার মতো চাঁদা আদায় করা হয়। সে হিসেবে এই রুটগুলো থেকে মাসিক হিসাব করলে দেখা যায় মালিক সমিতির নামে ৫০ লক্ষাধিক টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। রূপসা-বাগেরহাট বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির নামে ১২টি রুটে প্রায় ২০০ বাস চলাচল করে। এ রুটগুলো থেকে প্রতিদিন মালিক সমিতির নামে প্রায় ৩৭ হাজার টাকার মতো চাঁদা আদায় করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। সে হিসেবে এ রুটগুলো থেকে মাসিক হিসাবে মালিক সমিতির নামে প্রায় ১২ লক্ষাধিক টাকা চাঁদা আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া খুলনা মোটর বাস মালিক সমিতি নামে প্রতিদিন সমিতি ও স্ট্যাটারদের চাঁদাসহ ১৫-২০ হাজার টাকা আদায় করত। সে হিসেবে মাসে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা এ রুটগুলো থেকে আদায় করা হতো। অন্যদিকে খুলনা মহানগরীতে ট্যাক্সিচালকদের দুটি ইউনিয়ন রয়েছে। প্রতিদিন ইউনিয়ন দুটির মাধ্যমে ৯ থেকে সাড়ে ৯ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করা হতো। সে হিসেবে মাসে প্রায় তিন লাখ টাকা আদায় করা হয়। ইজিবাইকচালকদের কাছ থেকে ১০-২০ টাকা হারে প্রতিদিন অন্তত ৮০ হাজার টাকার মতো চাঁদা আদায় করা হতো। সে হিসেবে মাসে ২৪ লাখ টাকা আদায় হওয়ার কথা। সব মিলিয়ে খুলনার পরিবহন সেক্টরে প্রতি মাসে প্রায় কোটি টাকার চাঁদা আদায় করা হয়েছে। মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নাম ব্যবহার করে পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি ওপেনসিক্রেট। এ ছাড়া রয়েছে এই অঞ্চলের বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন ‘খুলনা বিভাগীয় ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়ন’। এই সংগঠনের আয় সবচেয়ে বেশি, যার অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে সংবাদ হয়েছে। খুলনা বিভাগীয় ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি আবুল হোসেন কার্ফুর বিরুদ্ধে সংগঠনের প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
একটি বাসের চালকের সহকারী সোহেল শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই মাস ধরে প্রায় না খেয়ে দিন চলছে। সরকার ও ইউনিয়নের থেকে কিছু ত্রাণ পেয়েছি। কিন্তু মালিকপক্ষ গত দুই মাসে একটি টাকাও সাহায্য করেনি।’
একটি বাসের চালক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বাস মালিকরা প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেন। অথচ এই বিপদে একটি টাকাও আমাদের কপালে জোটেনি।’
করোনাকালে শ্রমিকদের পাশে না থাকার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে খুলনা বিভাগীয় ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম বক্স দুদু বলেন, ‘ আট হাজার শ্রমিকের মধ্যে ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আগে সাড়ে ২৪ টন চাল দিয়েছি। পরে আবার সিটি মেয়রের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের ২৪ টন চাল দিলাম। এভাবেই শ্রমিকদের পাশে আছি। তবে মালিকপক্ষ থেকে কোনো সাহায্য পাচ্ছেন না শ্রমিকরা।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে খুলনা মোটর বাস মালিক সমিতির সভাপতি এবং খুলনা পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি আবদুল গফ্ফার বিশ^াস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিকদের সহায়তা করতেছি। তবে সমষ্টিগতভাবে নয়, ব্যক্তিগতভাবে যা পারতেছি, করতেছি।’