জর্জ হেডলিকে শে^তাঙ্গরা ডাকতেন ‘ব্ল্যাক ব্রাডম্যান’ নামে। এটা শুনে জনৈক ক্যারিবিয়ান বৃদ্ধ নাকি বলেছিলেন, ‘কিসের ব্ল্যাক ব্রাডম্যান... বেঁটে অস্ট্রেলিয়ানকে বরং সাদা চামড়ার হেডলি বল না!’
ক্রিকেটে যেকোনো ক্ষেত্রে উৎকর্ষের মানদ- মনে করা হয় স্যার ডন ব্রাডম্যানের সাফল্যকে। ৫২ টেস্টে ৯৯.৯৪ গড়ে তিনি ৬৯৯৬ রান করেছেন। জর্জ হেডলি ২২ টেস্টে ৬০.৮৩ গড়ে করেছেন ২১৯০ রান। পারফরম্যান্সে দুজনের তুলনা চলে না। অথচ হেডলিকে নিয়ে ক্যারিবিয়ানদের কত অহংকার! স্রেফ অন্ধ ভালোবাসা, না এই অহংকারের ভিত্তি আছে কোনো?
হেডলি প্রথম টেস্ট সিরিজ খেলেছিলেন ১৯৩০ সালে। তখন উইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের বয়স মাত্র দুই বছর। অন্যসব কলোনিয়াল প্রতিষ্ঠানের মতোই তারা ছিল প্রভুভক্ত এবং দুর্নীতিপরায়ণ। দল নির্বাচনে মেধার মূল্যায়ন ছিল না। কালোদের নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখা হতো আইন করে। এমন প্রতিকূল পরিবেশে ক্রিকেট শুরু করে টানা এক দশক খেলেছেন হেডলি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যে ১৯ টেস্ট খেলেছে উইন্ডিজ, সবগুলোতে জায়গা পাকা ছিল তার। দল যা রান করেছে তার শতকরা ২৬.৯ ভাগ এসেছে হেডলির ব্যাট থেকে। এখানে ব্রাডম্যানের চেয়ে এগিয়ে আছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ৩৭ টেস্ট খেলেছে। মোট দলীয় রানের ২৬.৫ শতাংশ করেছেন ব্রাডম্যান। সেঞ্চুরির পরিসংখ্যানেও পিছিয়ে তিনি। যুদ্ধের আগে উইন্ডিজ দলের ১৫ সেঞ্চুরির ১০টি এসেছে হেডলির ব্যাট থেকে। অস্ট্রেলিয়া দলের ৪৬ সেঞ্চুরির মধ্যে ব্রাডম্যান করেছেন ২১টি।
পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট সেই সময় উইন্ডিজের ভার একা কাঁধে বইতেন হেডলি। এ কারণে সিবি ফ্রাই তাকে বলতেন ‘অ্যাটলাস’। গ্রিক পুরাণের সেই শক্তিমান, যাকে দেবতা জিউসের নির্দেশে অন্তরীক্ষের ভার বহন করতে হয়েছিল। হেডলি জীবনভর বয়ে বেরিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ব্যাটিংয়ের গুরুভার।
মাত্র ২০ বছর বয়সে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার অভিষেক হয়েছিল। চার টেস্টের সেই সিরিজে ৮৭.৯ গড়ে ৭০৩ রান করেছিলেন হেডলি। দলে একমাত্র তিনিই ছিলেন নিয়মিত। বাকি জায়গাগুলোতে ২৮ জনকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলানো হয়েছিল। আসলে গড়পড়তার উইন্ডিজ দলে হেডলি ছিলেন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। শৃঙ্খলায় এগিয়ে ছিলেন। বুদ্ধিমত্তায়ও। ভারতের জয় আটকাতে বোলারদের একবার লেগ স্টাম্পের বাইরে বোলিংয়ের পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা কাজেও লেগেছিল। এমন কৌশলী হওয়ার পরও দলের অধিনায়ক হতে পারেননি, শুধু কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে তার ব্যাটিং গড় ৬৬.৭। সতীর্থদের মধ্যে অন্তত ৫ টেস্ট খেলেছেন এমন কারও গড় ৩১-এর ওপর ছিল না। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩০.৭ গড় ছিল ক্লিফোর্ড রোচের। সেই সময় ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান দলের অধিনায়কত্ব করা শে^তাঙ্গদের অবদান ছিল মাত্র পাঁচটা হাফসেঞ্চুরি।
হেডলি তার ক্যারিয়ারের ১০ সেঞ্চুরির আটটিই করেছেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ১৯৩৯ সালে লর্ডসে দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করেছিলেন। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত (১৯২৯-১৯৩৯) কোনো বাজে সিরিজ কাটাননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চুটিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছেন। ৭২.২১ গড়ে ৯৫৩২ রান করেছেন। খেলা ছাড়ার সময় প্রথম শ্রেণিতে তার গড় কমে ৬৯.৮৬ হয়েছিল। ৩৩টি সেঞ্চুরিসহ ৯৯২১ রান করেছিলেন তিনি।
১৮৮৩ সালের ৩০ মে পানামায় জন্ম জর্জ হেডলির। ১০ বছরের বালক বাবার হাত ধরে গিয়েছিলেন জ্যামাইকায়। স্কুলে পড়ার সময় ক্রিকেটের প্রেমে পড়েন। বয়স তার তখনো ১৯ হয়নি, এল এইচ টেনিসনের ইংলিশ দলের বিপক্ষে ৭৮ ও ২১১ রানের ইনিংস খেলে হইচই ফেলে দেন। এমন ব্যাটিংয়ের পরেও কিন্তু ১৯২৮ সালের ইংল্যান্ড সফরে ডাক পাননি। পরের বছর ক্যারিবিয়ান সফরে আসে ইংল্যান্ড। ব্ল্যাক ব্রাডম্যান এবার নিজেকে চেনানোর সুযোগ পেলেন। প্রথম টেস্টে করেছিলেন ২১ ও ১৭৬। দ্বিতীয় টেস্টে (৮ ও ৩৯) তেমন কিছু করতে পারেননি। তৃতীয় টেস্টে ১১৪ ও ১১২। চতুর্থ টেস্টে ১০ ও ২২৩। ১৯৩০-৩১-এর অস্ট্রেলিয়া সফরে আরও দুটি সেঞ্চুরিসহ করেন ১০৬৬ রান।
১৯৩২-এ জ্যামাইকা সফরকারী ইংল্যান্ড দলের বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ৩৪৪ রানে অপরাজিত ছিলেন হেডলি। সেই ইংল্যান্ড দলে ছিলেন ক্ল্যারি গ্রিমেট। সফর শেষে তিনি বলেছিলেন, ‘অনসাইডে এমন শক্তিশালী ব্যাটসম্যান আমি জীবনে দেখিনি।’ একেবারে শেষ মুহূর্তে বল ব্যাটে খেলতেন তাই ফিল্ড প্লেসিংয়ে নাস্তানাবুদ হতেন লেন হটন। বলেছিলেন, ‘এ তো দেখি শট সিলেকশনের রাজা।’ তবে যে যাই বলুন, সবচেয়ে ভালো কথাটা বলেছেন জ্যামাইকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিচেল ম্যানলে। তার চোখে জর্জ হেডলি ‘শে^তাঙ্গদের খেলায় কৃষ্ণাঙ্গদের উৎকর্ষের প্রতীক।’
এমন একজনকে শে^তাঙ্গরা ‘ব্ল্যাক ব্রাডম্যান’ বললে ক্যারিবিয়ানরা মানবে কেন?