বাজেটে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি নয়

দীর্ঘদিনের সাধারণ ছুটি ও লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি এসেছে, অনেক ক্ষেত্রে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের অভিঘাতে কর্মহীন অনেক মানুষ। রোজগারের উৎসগুলো সংকুচিত বা বন্ধ হওয়ায় নিম্নআয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। শুধু নিম্নআয়ের মানুষই নয়, মধ্যবিত্তও এখন নানা সংকটে। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের কথা তো বহুল আলোচিত। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা সমাজের সব ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছে। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন বাজেটে রাজস্ব আদায়ের বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। নানামুখী অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ঘটলে তা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবেই বিবেচিত হবে।

চলতি অর্থবছরে (২০১৯-২০) এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট খাতে সর্বোচ্চ ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়কর খাতে ১ লাখ ১৫ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা ও শুল্ক খাতে ৯২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির কারণে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের তিন খাতেই লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করা হয়েছে। ভ্যাট খাতে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা, আয়কর ১ লাখ ২ হাজার ২০১ কোটি টাকা ও শুল্ক ৮৪ হাজার কোটি টাকা ধার্য করা হয়। এ তিন খাত মিলিয়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বাজেটের অর্থায়নের প্রায় ৬০ ভাগ জোগাড়ের দায় পড়ে এনবিআরের কাঁধে। রাজস্ব আদায়ের নিরাপদ খাত হিসেবে প্রতি বছরই ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়। এতে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ে। আগামী অর্থবছরেও অতীতের ধারা বজায় থাকবে বলে জানা গেছে। গত ১০ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ ঘাটতি ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটেও এনবিআরের বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তারা এনবিআরের জন্য ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে আগামী অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের কৌশল নির্ধারণে কাজ করছেন।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার আরও ৩০-৪০ হাজার কোটি টাকার কম রাজস্ব আদায় হবে। সব মিলিয়ে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার যে মূল লক্ষ্য ছিল, তা থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার মতো ঘাটতি হতে পারে। ২ লাখ ৫ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হবে। এ বছর যদি গতবারের সমান রাজস্ব আদায় হয়, তাহলে এনবিআরকে ‘ভাগ্যবান’ মনে করতে হবে। খুব ভালো রাজস্ব আদায় হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি বিবেচনা করলে আগামী অর্থবছরে এনবিআরকে রাজস্ব আদায়ে ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, যা কোনো দিন এনবিআর পারেনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন অবস্থায় রাজস্ব খাতে আমূল সংস্কার ছাড়া এত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব নয়। এই সংস্কার এক দিনে করা সম্ভব নয়। এজন্য আগামী অর্থবছর থেকেই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার শুরু করা উচিত। প্রথমেই অটোমেশনে নজর দেওয়া উচিত। এতে দুর্নীতি-অনিয়ম কমবে। কর কার্যালয়গুলো মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া কর ফাঁকি প্রতিরোধে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দ্রুত বিদ্যমান আইনগুলো যুগোপযোগী করতে হবে।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আগে আসন্ন বাজেটে বড় ধরনের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে যেন সাধারণ জনগণ নিষ্পেষিত না হয়, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার কিছু পদক্ষেপ নিলে এটি জনগণের জন্য কল্যাণমুখী বাজেটও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা যেতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশে একেবারে কম দামে তেল পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের দেশে এটি বাস্তবায়ন করা গেলে শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ কমবে, বাড়তি যানবাহন ভাড়া থেকে রেহাই পাবে নাগরিকরা। এছাড়া মধ্যবিত্তের জন্য সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর কমানো যেতে পারে। এটির মাধ্যমে যাদের কাজ নেই এবং কাজ করার সক্ষমতাও নেই, তাদের আয় বাড়বে, তারা চলতে পারবে। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনায় খেলাপিদের বাদ দিতে হবে। ব্যাংক খাতের ৯-৬ তত্ত্বসহ আসন্ন বাজেটে সঞ্চয়পত্রের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। সর্বোপরি, মানুষের কর্মসংস্থানে নিশ্চিত করা জরুরি। কর্মসংস্থান তথা আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করতে পারলে মানুষের ওপর চাপ কমে যাবে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যেন কোনোভাবেই বৃদ্ধি না পায়, বাজেট প্রণয়নে নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়টি বিবেচনা করবেন এটাই সবার প্রত্যাশা।