চিকিৎসা পাচ্ছে না রোগীরা

খুলনা মেডিকেল কলেজের (খুমেক) মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের পিসিআর মেশিনে একদিনে করোনার নমুনা পরীক্ষার সর্বোচ্চ সক্ষমতা ১৯২টি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিনই নমুনা আসছে এর থেকে কয়েকগুণ বেশি। এ পরিস্থিতিতে পরীক্ষার ফলাফল সময়মতো না পাওয়ায় বিনা চিকিৎসায় অনেক সাধারণ রোগীর মৃত্যু হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের স্বজনরা বলছেন, ভর্তি রোগীর নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পেতে কমপক্ষে পাঁচ দিন বা তারও বেশি সময় লাগছে। আর এই সময়ে চিকিৎসক বা নার্সরা রোগীদের ধারেকাছেও আসছেন না। ফলে করোনা আক্রান্ত না হয়েও অনেক সময় বিনা চিকিৎসায় বা সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুমেক হাসপাতালের করোনা সাসপেকটেড আইসোলেশন সেন্টারে সর্বশেষ গত ৩ জুন তিনজনসহ এ পর্যন্ত ২৫ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আর এ পর্যন্ত জ্বর-কাশি ও শ্বাসকষ্টসহ করোনার মতো উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৯ জনের। এর মধ্যে শিশু ছিল ৮ জন। কিন্তু দেখা যায় মৃত্যুর পর মাত্র ২ জনের শরীরে করোনার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বাকি ২৭ জনের মৃত্যুর পর নমুনা পরীক্ষায় করোনার উপস্থিতি মেলেনি।

খুমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীদের আনেকেই বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন। নড়াইলের কালিয়ার বাসিন্দা নাজমা বেগম (৩২)। গত ২৮ এপ্রিল এসে ভর্তি হয়েছিলেন খুমেক ফ্লু কর্নারে। সেখানে করোনা পরীক্ষার নমুনা দেওয়ার পর ফলাফল পেয়ে চিকিৎসা নিতে সাধারণ ওয়ার্ডে যেতে পেরেছেন ৪ জুন রাতে। নাজমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরীক্ষায় আমার করোনা ধরা পড়েনি। কিন্তু সঠিক চিকিৎসা ছাড়া এভাবে একজন রোগীকে ৫-৬ দিন অপেক্ষা করিয়ে রাখার অর্থ জেনেশুনে তার মৃত্যু ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়া। পরীক্ষার ফল পেতে যে কয়েকদিন সময় লেগেছে, এর মধ্যে কোনো ডাক্তার বা নার্স কাছেও আসেননি।’

সাতক্ষীরা থেকে খুমেকে চিকিৎসা নিতে আসা হাফিজুর রহমানের স্বজন আজাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাচার করোনার রিপোর্ট পেতে ৪/৫ দিন লেগে গেল। এরপর জানলাম তার করোনা হয়নি। শ্বাসকষ্ট ও লিভারের সমস্যা। এই কয়দিন এক প্রকার বিনা চিকিৎসায় তার দিন কাটল।’

খুমেক কর্মকর্তারা জানান, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের পিসিআর মেশিনে একদিনে করোনা পরীক্ষার সর্বোচ্চ সক্ষমতা ১৯২টি। গত ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ৪ জুন পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ৭ হাজার ৩৩টি। সম্প্রতি যশোর ও কুষ্টিয়ায় পরীক্ষা শুরু হলে খুলনার ল্যাবে নমুনা আসার পরিমাণ কিছুটা কম ছিল, কিন্তু হঠাৎ করে নমুনা আসার পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত এই ল্যাবে এক হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে পরীক্ষা করলেও তা শেষ হতে অন্তত ৫ দিন লাগবে। আর এর মধ্যে আরও নমুনা এলে স্বাভাবিকভাবেই একজন রোগীর নমুনা নেওয়ার পর পাঁচ দিনের বেশি সময় লাগবে ফলাফল দিতে।

খুমেক হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে বলেন, খুলনার বাইরে বিশেষ করে যশোর ও কুষ্টিয়ার পাশাপাশি সাতক্ষীরায়ও ল্যাব স্থাপন করা জরুরি। এতে খুলনার ওপর চাপ কমবে। এর পাশাপাশি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও পিসিআর মেশিন থাকায় তাদের মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে পরীক্ষা চালু করতে হবে।

খুলনার সিভিল সার্জন সুজাত আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিপোর্ট না পেলে চিকিৎসা দিতে তো সমস্যা হয়। যশোরের মেশিন খারাপ হওয়ায় পুরো খুলনা বিভাগের চাপটা আমাদের ওপর এসে পড়েছে। যশোরের মেশিনটি ভালো হলে আমরা ২/৩ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে পারব। তখন রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যাবে।’

নমুনা পরীক্ষার ফলাফল দিতে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে খুমেকের সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম তুষার আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খুলনার বাইরেও সঠিক ও নির্ভুল পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। সম্ভব হলে জেলায় জেলায় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে  খুলনার ওপর চাপ কমবে। অন্যথায় বর্তমানে যে পরিস্থিতিতে নমুনা পরীক্ষা চলছে, তাতে কমপক্ষে ৫ দিনের বেশি সময় লাগবে একজনের রিপোর্ট পেতে।’