মোবাইল ব্যাংকিং ও ডেবিট, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি চক্রের ১৩ হোতাকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। তাদের কাছে ১৪ লাখ ৮৩ হাজার ৪৬২ টাকা, ৩১টি মোবাইল ফোন, দুটি ল্যাপটপ, দুটি ট্যাব, ১২০টি সীম, একটি রাউটার ও একটি টিভি কার্ড উদ্ধার করা হয়।
রবিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সারওয়ার বিন কাশেম এ তথ্য জানান। গত শনিবার রাতে ঢাকা ও ফরিদপুর থেকে র্যাব-৮ ও ২ এর যৌথ অভিযানে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- নাজমুল জমাদ্দার (১৯), হাসান মীর (১৮), ইব্রাহিম মীর (১৮), তৌহিদ হাওলাদার (২৩), মোহন শিকদার (৩০),পারভেজ মীর (১৮), সোহেল মোল্লা (২৬), মো. দেলোয়ার হোসেন (৩৫),সৈয়দ হাওলাদার (২০), বাকির হোসেন (২৪),মোহাম্মদ আলী মিয়া (২৬), পলাশ তালুকদার (৩৪), মো. ইমন (২৫)। এদের সবার বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গায়।
র্যাব জানায়, অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জনের সংঘবদ্ধ এই চক্র পাঁচটি ভাগে বিভক্ত হয়ে মোবাইল ব্যাংকিং ও কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। হান্টার, স্পুফিং, ফেইক কাস্টমার কেয়ার, টাকা উত্তোলন ও ওয়াচম্যান এই পাঁচটি দলে ভাগ হয়ে জালিয়াতি করে চক্রটি। তাদের মূল টার্গেট পেশাজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও গার্মেন্টস কর্মী । চক্রের অধিকাংশের নির্দিষ্ট পেশা নেই। তবে মানুষকে প্রতারিত করে তারা কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করে নামে বেনামে বাড়ি, গাড়ি, দোকান, জায়গা জমি ক্রয় করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, কাস্টমার কেয়ারের প্রধানই মূল মাস্টার মাইন্ড। একজন মাস্টার মাইন্ড বা মূল হোতা হান্টার টিমের কাছ থেকে গ্রাহকদের নাম্বার সংগ্রহ করে স্পুফিং টিমকে দেয়। স্পুফিং টিম তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে কাস্টমার কেয়ারদের নাম্বার/সংস্থার নাম স্পুফিং করে থাকে। ফেইক কাস্টমার কেয়ারের সদস্যরা গ্রাহককে প্রতারিত করে বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে বা অনলাইনে কেনা কাটা করে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে।
এই ৫টি গ্রুপের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, হান্টার গ্রুপ মূলত গ্রাহকদের মোবাইল নম্বর ও তথ্যাদি সংগ্রহ করে মাস্টার মাইন্ডকে সরবরাহ করে থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অফিসের কর্মচারী, মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট, গার্মেন্টস কর্মী, বিক্রয়কেন্দ্র, অনলাইন কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মীদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে নাম্বার সংগ্রহ করে থাকে।
স্পুফিং গ্রুপের কাজ হলো নম্বর ক্লোন করা। এ দলের সদস্যরা তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে মোবাইল নম্বরগুলো স্পুফিং করে থাকে। স্পুফিং এর ফলে গ্রাহক প্রতারিত হয়। প্রতিটি স্পুফিং এর জন্য তারা মাস্টার মাইন্ড এর কাছ থেকে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা করে পায়। এছাড়াও কল ডিউরেশন অনুযায়ী আলাদা করে টাকা পেয়ে থাকে।
ফেইক কাস্টমার সেন্টারের কাজ বিভিন্ন নম্বরে ফোন করে কৌশলে প্রতারণার মাধ্যমে পিন কোড নেওয়া। মাস্টার মাইন্ড নিজেই সাধারণত এই দলটির পরিচালনা করে থাকে। একজন মাস্টার মাইন্ডের অধীনে তিন থেকে পাঁচজন মূল কর্মী থাকে। প্রত্যেক কর্মীর আবার দুই জন করে সহযোগী থাকে। প্রতিটি কাস্টমার কেয়ারের ১৫-২০ জন সদস্য থাকে। সাধারণত মাস্টার মাইন্ড অথবা তাদের মধ্যে হতে একজন কাস্টমার কেয়ার সেজে গ্রাহকের সাথে কথা বলে বিভিন্ন তথ্য দেওয়া ও নেয়ার কাজ করে থাকে। কথোপোকথনের সময় কর্মী ও সহযোগীরা কেউ তথ্য লিপিবদ্ধ করে, কেউ অন্য মোবাইলে প্রাপ্ত তথ্য ইনপুট দিয়ে অ্যাকাউন্ট এর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে থাকে। তারা সাধারণত চরের কোন নির্জন জায়গা বা গাছপালা ঘেরা নিরাপদ স্থান বেছে নেয়। কার্যক্রম পরিচালনার সময় অন্য সহযোগীরা এমনভাবে কথা বলতে থাকে যেন ফোনের অপর প্রান্ত হতে একটি অফিশিয়াল এনভারনমেন্ট মনে হয়।
উত্তোলন দলের কাজ হলো বিভিন্ন জায়গায় তাদের লোক বসিয়ে টাকা তুলে নেওয়া। গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার হওয়ার পর সিন্ডিকেটের মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের মাধামে টাকা উত্তোলন করা হয়ে থাকে। ভাঙ্গা, ফরিদপুর ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের সমমান এজেন্ট রয়েছে। এভাবে প্রতারণাকৃত অর্থ কয়েকটি জায়গায় প্রেরণ এর মাধ্যমে নিরাপদ জায়গা থেকে তুলে নেয়। এ চক্রের কারও কারও আবার নামে/বেনামে এজেন্টশিপ রয়েছে। এজেন্টরা হাজারে দুইশত টাকা কমিশন পেয়ে থাকে।
ওয়াচম্যানের কাজ হলো- বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট পানের ও মুচির দোকানসহ বিভিন্ন দোকান নিয়ে বসিয়ে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর উপস্থিতি বা গতিবিধি দেখা। লটারি জেতা ও তার জন্য কুরিয়ারের চার্জের কথা বলেও টাকা হাতিয়ে নেয় বলে তিনি জানান।
এই র্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং করতে গিয়ে প্রতারণা শিকার হচ্ছেন অনেক মানুষ। আর করোনাভাইরাসের সময় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেনে বেড়ে যাওয়ার সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে এই প্রতারক চক্র। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই ১৩ জন আগে কখনও গ্রেপ্তার হয়নি। এদের মধ্যে মোহন জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে, গত দুই মাসে সে এক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।