পুলিশের হস্তক্ষেপে ঘর পালানো কিশোরী বুঝে পেল ৭ বছরের বেতন

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারেনি কিশোরী সুরমা। কিন্তু মা যখন আবার বিয়ে করে ঘর বাঁধলেন নতুন জায়গায়, এবার সুরমা বিদ্রোহ করল। উত্তাল মেঘনার বুকে জেগে ওঠা দ্বীপে যার জন্ম-বেড়ে ওঠা, তাকেই তো বিদ্রোহী হওয়াই মানায়। প্রিয়জন বলতে বাবা ছিলেন, তিনি নেই। মা অপরিচিত একজনের স্ত্রী। সুরমার আপন বলতে কেউ রইল না। সুতরাং, কাউকেই কিছু বলার প্রয়োজনও হয়নি তার। সেদিনই বাড়ি থেকে অজানার পথে পা বাড়াল নদীর নামে নাম রাখা ১৪-১৫ বছরের অভিমানী মেয়েটি। নদীর নামে মিল বলে সুরমাও কি তবে নদীর মতো দিশেহারা, গতিহারা?

এতক্ষণ যে ভূমিকাটি পড়লেন সেটি ৬-৭ বছর আগের কাহিনী। চলুন সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো জেনে নেওয়া যাক। ভোলার চরফ্যাশনের কিশোরী ঘর পালিয়ে কেমন করে রাজধানী ঢাকায় এসেছিল, সে কাহিনি আজ নাই বললাম। মেয়েটির ভাগ্য ভালো। সে ধানমন্ডির এক প্রবাসীর বাসাবাড়িতে কাজ পায়। কাজের বিনিময়ে খাদ্য ও আশ্রয়ণ। কোন বেতন নেই। সুরমা এতেই খুশি। কিন্তু সম্প্রতি সুরমার সাথে গৃহকর্ত্রীর মনোমালিন্য হয়। সুরমা ছোটখাটো বিদ্রোহ করে বসে যেটা মেনে নিতে পারেননি কর্ত্রী। দুই চারটা চড়ও হয়তো দিয়ে বসেছেন সুরমার মুখের ওপর! এতে আরও বেঁকে বসেন বাড়ি পালানো সেই কিশোরী যিনি আজ বেশ পরিণত।

টানা অর্ধ যুগের বেশি ওই বাসায় কাজ করেও বেতন হিসেবে কোনদিন টাকা পয়সা নেননি। আসলে সুরমা কি জানতেন ঢাকা শহরে বাসায় কাজ করলে বিনিময়ে বেতনও দেওয়া হয়? নাকি খাবার-আশ্রয় পেয়ে চুপ থাকতেন? বিদ্রোহ যার ধমনিতে খেলা করে, তিনি আর কতই বা পেশাদার হতে পারেন? এত ভালো একজন কাজের মেয়ে কেই বা হারাতে চান? গৃহকর্ত্রী এক ফন্দি আঁটলেন। ধানমন্ডি থানায় গিয়ে সুরমার বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের টাকা ও অর্থচুরির এক অভিযোগ জমা দিলেন। কর্ত্রী ভাবলেন মামলার ভয়ে সুরমা এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো বাসার কাজে মন দেবেন।

এদিকে মামলা না নিয়ে ধানমন্ডির ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিলেন ঘটনাটা তদন্ত করে দেখার। কিন্তু যার শিরায় শিরায় দ্রোহ, তাকে কি মামলার ভয় দেখিয়ে কাবু করা যাবে? তদন্ত যখন চলমান এর মধ্যে একদিন থানায় এসে হাজির উত্তাল মেঘনার বুকে জন্ম নেওয়া আজন্ম বিদ্রোহী সুরমা। সে পুলিশের কাছে জানতে চায় তার নামে নাকি বাড়িওয়ালা মামলা করেছে! সে জানায়, চুরি ডাকাতি তার চরিত্রে আগেও ছিল না, এখনও নেই। যার বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের চুরির অভিযোগ থানায় জমা পড়েছে, সেই ব্যক্তি যখন থানায় এসে এমন হুংকার দেন, পুলিশকে তো তখন নড়েচড়ে বসতেই হয়।

দুই পক্ষকে থানায় ডাকা হলো। পুলিশের জেরার মুখে গৃহকর্ত্রী স্বীকার করলেন সুরমা নির্দোষ। এবার তো তাহলে গৃহকর্ত্রীর নামে উল্টো মামলা হওয়ার মতো অবস্থা। এ যেন “পড়বি পড় মালির ঘাড়ে”র মতো অবস্থা। পুলিশের জেরায় গৃহকর্ত্রী স্বীকার করলেন সুরমা থাকা খাওয়া বাদে গত ৬-৭ বছর কাজের বিনিময়ে কোন বেতন নেননি।

ভাবা যায় ঢাকা শহরে ৬-৭ বছর একটা মেয়ে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন বিনিময়ে একটা টাকা বেতন ছাড়া!

পুলিশের চাপে নতি স্বীকার করে এবার গৃহকর্ত্রীকে সুরমার সব পাওনা কড়ায় গন্ডায় পরিশোধ করতে হবে। ধানমন্ডি জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল্লাহেল কাফি জানান, মাসে দুহাজার টাকার কিছু বেশি হিসেবে সাত বছরে সুরমার মোট বকেয়া বেতন নির্ধারণ করেন ১৮২,০০০ টাকা। এত টাকা সুরমা পায় বাড়ির মালিকের কাছে? তিনি জানান, দুদফায় সুরমার বকেয়া পুরো টাকা শোধ করেছেন গৃহকর্ত্রী। 

সুরমার পক্ষে থানায় উপস্থিত ছিলেন তার মা-বাবা! যাদের সাথে বিদ্রোহ করে ভোলা থেকে পালিয়ে অর্ধযুগ আগে ঢাকায় এসেছিল কিশোরী সুরমা। তারা মেয়ের ডাকে ঢাকায় ছুটে এসেছেন। সুরমার মা কান্না জড়িত কণ্ঠে পুলিশকে জানায়, তার মেয়ে সেই যে বাড়ি ছাড়ল এরপরে একটা বারের জন্য তাদের সাথে যোগাযোগ করেন নি! প্রথম দিকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাইনি। পরে তার আশা ছেড়ে দিই। অবশেষে পুলিশের ডাকে থানায় এসে ওকে আমরা পেয়েছি।

গল্পটি বাংলা সিনেমার মতোই কিছুটা মিলনাত্মক ধাঁচের। সুরমার বাবা মা তাকে এতগুলো দিন পরে খুঁজে পেলেন, আর সুরমাও পেলেন পরিশ্রমের ন্যায্য মজুরি–প্রায় দুই লাখ টাকা!

ধানমন্ডি জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল্লাহেল কাফি জানালেন, তারা সুরমার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে চেয়েছিলেন একটা ফিক্সড ডিপোজিট করে দিতে। পুলিশ পকেট থেকে বাকি ১৮,০০০ টাকা উপহার হিসেবে দিতে চেয়েছিলেন যাতে দুই লাখ টাকার একটা ডিপোজিট হয় কিন্তু প্রমত্তা মেঘনার ঢেউয়ে বেড়ে ওঠা সুরমা নামের এই আজন্ম বিদ্রোহী এই প্রস্তাবে রাজি নন।