মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে বসতভিটাসহ সব হারানো ক্ষিতীশ দেবনাথ তার পরিবার দীর্ঘ ১০ বছর ধরে বসবাস করছেন এক মুসলিম বাড়িতে।
ঘোড়াচাউ এলাকার বাসিন্দা ক্ষিতিশ দেবনাথের শ্বশুরবাড়ি মুন্সীবাজার ইউপির লক্ষ্মীপুর গ্রামে। সব হারিয়ে ভূমিহীন হয়ে ক্ষিতীশ দেবনাথ তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে কাজের সন্ধানে আসেন কমলগঞ্জ সদর ইউপির ভেড়াছড়া গ্রামে। আত্মসম্মানের কারণে শ্বশুর বাড়ি আশ্রয় না নিয়ে ভেড়াছড়া গ্রামে কাজ ও আশ্রয় চাইলে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন এ গ্রামের নজরুল ইসলাম (৪২)।
নজরুল ইসলাম ধর্ম, বর্ণ সব ভুলে গিয়ে মানুষ হিসেবে স্ত্রী সন্তানসহ ক্ষিতীশ দেবনাথকে তার টিন শেডের বাড়িতে আশ্রয় দেন। সম্ভব হলে ধীরে ধীরে আলাদা ঘর নির্মাণ করে এই বাড়িতে বসবাস করার কথা তিনি জানান। সেই থেকে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে নজরুল ইসলাম সম্প্রীতির অটুট বন্ধন গড়ে তুলে ক্ষিতীশ দেবনাথকে নিয়ে একই বাড়িতে বসবাস করছেন।
একই বাড়িতে নজরুল ইসলাম মুসলিম হিসেবে তার ধর্ম পালন করছেন, আবার ক্ষিতীশ দেবনাথের পরিবারও আলাদাভাবে হিন্দু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান করছেন।
সম্প্রতি ভেড়াছড়া গ্রামে নজরুল ইসলামের বাড়িতে গেলে ক্ষিতীশ দেবনাথের স্ত্রী অঞ্জলি দেবনাথ দেশ রূপান্তরকে জানান, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তারা এ বাড়িতে মুসলিম পরিবারের সাধে বসবাস করছেন। ধর্মীয় উপাসনাসহ সকল প্রকার আচার অনুষ্ঠান করলেও কোন সমস্যা হচ্ছে না।
ক্ষিতীশ দেবনাথ পাহাড়ে ও গ্রামে দিন মজুরের কাজ করে যে আয় করেন তা দিয়ে সংসার চালান। এ আয় দিয়ে সংসার পরিচালনার সাথে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়াও করাচ্ছেন। স্বামী যে স্বল্প আয় করেন তা থেকে সঞ্চয় করার মতো কিছু থাকে না বলে গত ১০ বছরেও নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই করার মতো এক টুকরো জমি কিনতে পারেননি তারা। যতদিন না নিজের জমি কেনা হয় ততদিন পর্যন্ত এ বাড়িতে তারা বসবাস করবেন বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন, এক বাড়িতে হিন্দু মুসলিম দুই পরিবার মিলে বসবাস করছেন। নেই কোন ঝগড়া-বিবাদ। দুই ধর্মের দুই পরিবারের মাঝে যে সম্প্রীতির সৃষ্টি হয়েছে সেটি আজীবন ধরে রাখতে চান তারা। একই সৃষ্টিকর্তার এক পরিবার আল্লাহর প্রার্থনা করছেন আর অন্য পরিবার ভগবানের প্রার্থনা করছেন। বাইরে থেকে কেউ হঠাৎ সেখানে গেলে বুঝতেই পারেন না যে এক বাড়িতে দুই ধর্মের দুই পরিবারের বসবাস রয়েছে। গ্রামবাসীও এ সম্প্রীতিকে মেনে নিয়েছে বলে গ্রাম থেকে কোন সমস্যা হয়নি গত ১০ বছরেও।
আলাপকালে বাড়ির মালিক নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি অসহায় পরিবার কাজ ও বসবাসের জায়গা খুঁজতে এসে বিপদে পড়েছিল। কোথাও কোন ঠাঁই পায়নি। তখন তার বিবেক থেকে মানবিকতার তাড়নায় অবশেষে হিন্দু পরিবারটিকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিই। মিলে মিশে বসবাস করায় কিভাবে যে ১০টি বছর চলে গেছে তা তিনি বুঝতেও পারেননি। আর এই ১০ বছরে দুই ধর্মের দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যেন আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তা আর ভেঙে যাবার মতো নয়। তাই তার বাবা শফিক আলীও ক্ষিতীশ দেবনাথকে নিজের ছেলে ভেবে নিয়েছেন।
বৃদ্ধ শফিক আলী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, তার ছেলে যে কাজটি করেছে তা ভেবে তিনি গর্ব বোধ করেন। তার ছেলের পরিবারের ধর্ম-কর্ম করতে কোন সমস্যা হয় না। এমনি ক্ষিতীশের পরিবারের ধর্ম-কর্ম করতে কোন সমস্যা হয়নি ১০ বছরে। আগামীতেও হবে না। ছেলের এ কাজটি সমাজে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে বৃদ্ধ বাবা মনে করেন।