২০২০-২১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট কোনো স্বাভাবিক বছরের বাজেট নয়, বরং করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে অনিশ্চিত ও স্থবির হয়ে যাওয়া অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার বাজেট। এই বাজেটকে ঘোর দুর্যোগেপড়া অর্থনীতির জাহাজের হাল ধরে থাকার বাজেটও বলা যেতে পারে। আর অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে মানুষের জীবন ও জীবিকা দুটোকে পাশাপাশি চলতে হবে। দেশের সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা দিয়ে যদি অর্থনীতির হাল ধরে রাখা যায় তাহলেই তা হবে এ বাজেটের সাফল্য। তাই এই বাজেটে শিল্প খাতের মধ্যে অণু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে সবচেয়ে বেশি। এর পাশাপাশি অণু ও ক্ষুদ্র আকৃতির খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা যারা আছেন, তাদেরও সহযোগিতা দিতে হবে।
২০১৬ সালের শিল্পনীতির সংজ্ঞা অনুযায়ী ১৬ থেকে ৩০ পর্যন্ত কর্মীর প্রতিষ্ঠান অণু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। ২০১৯ সালের শিল্প খাতের জরিপ অনুযায়ী দেশে ৪৬ হাজার ২৯১ শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে (এরমধ্যে গৃহকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত নয়), যার ৯৩% অণু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এই জরিপ অনুযায়ী অণুু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে কর্মসংস্থান হয় মোট শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের ৩১.৫ শতাংশ। জিডিপির ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ আসে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে। এ খাতের উদ্যোক্তাদের আয় ও সঞ্চয় সীমিত তাই যেকোনো অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাও কম। তবে বিশেষ করে অণু ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের সংখ্যা কম হওয়ায় ভাইরাস সংক্রমণের স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। তাই জীবন ও জীবিকার ভারসাম্য রক্ষা করতে হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে অণু ও ক্ষুদ্রশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোয় উৎপাদন চালু রাখতে হবে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ঠিক থাকবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি কম হওয়ার সম্ভাবনা এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখবে। তাই চলমান বাজেটে এই শিল্পগুলোতে পুঁজি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি এদের বিপণন এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে।
শিল্পখাতের অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ছাড়াও বাজেটের সহায়তা দরকার এরূপ পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ অর্থনৈতিক জরিপ হয়েছিল ২০১৩ সালে। সেই জরিপ অনুযায়ী কৃষি বহির্ভূত খাতে দেশের মোট ৭৮ লাখ এন্টারপ্রাইজের মধ্যে প্রায় ৩৬ লাখ এন্টারপ্রাইজ হলো পাইকারি ও খুচরা বিক্রয় বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ কৃষিবহির্ভূত খাতের প্রায় ৪৬ ভাগই হচ্ছে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায় নিযুক্ত প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান ৮৫ ভাগ হলো অতিক্ষুদ্র, যাদের কর্মচারীর সংখ্যা ১০ জনের কম। দেশের কৃষিবহির্ভূত কর্মসংস্থানের ৩৫ ভাগ হয় পাইকারি ও খুচরা বিক্রির ব্যবসায়। এই ব্যবসা-বাণিজ্যে ২০১৩ সালে নিযুক্ত ছিল প্রায় ৮৪ লাখ মানুষ। গত সাত বছরে প্রতিষ্ঠান সংখ্যা বেড়েছে বছরে প্রায় ৭.২ শতাংশ হারে। সে হিসাবে বর্তমানে প্রায় ৫৯ লাখ এন্টারপ্রাইজ আছে। আর ২০১৬-১৭ এর শ্রম জরিপ অনুযায়ী পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায় নিয়োজিত আছে প্রায় ৮৭ লাখ মানুষ। আর এসব দোকানপাট ব্যবসার পেছনে আমদানিকৃত পণ্য ছাড়াও দেশীয় বহু ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন নির্ভর করে। কারণ দোকানপাটের মাধ্যমে বিক্রির জন্য উৎপাদন করা হয়।
করোনাভাইরাসের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে ইতিমধ্যে শিল্প ও বাণিজ্য উভয় খাতের অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দেশীয় উদ্যোক্তাদের বড় বিক্রির উৎসব বৈশাখ চলে গেছে কোনো উৎসব হয়নি, বেচাবিক্রিও হয়নি। ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র, কুটির শিল্প, মাঝারি উদ্যোক্তা পর্যন্ত উদ্যোক্তাদের সঞ্চয় খুবই কম থাকে। উদ্যোক্তারা এবং তাদের সঙ্গে যেসব শ্রমিক-কর্মচারী, ডিজাইনার শিল্পী কাজ করেন তাদের সবার আয় নির্ভর করে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির ওপর। দোকানপাট দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফলে লাখ লাখ উদ্যোক্তা ও শ্রমিকের জীবন বিপর্যস্ত। অর্থনীতির কার্যক্রম সীমিত আকারে শুরু হলেও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে স্বাভাবিক অবস্থা নেই। যেখানে বড় উদ্যোক্তারাও সরকারের সহযোগিতা কামনা করছেন, সেখানে ছোট উদ্যোক্তাদের দুর্ভোগের কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে যারা অণু উদ্যোক্তা অতিক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান তাদের জন্য বাজেটে বিশেষ উদ্যোগ না থাকলে টিকে থাকাই মুশকিল হবে।
ইতিমধ্যে সরকার অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছেন। তাছাড়া এনজিওদের মাধ্যমে অণু উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণের জন্য আরও তিন হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকা বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তার কাছে এই প্রণোদনার অর্থ পৌঁছাবে কি না তাতে সন্দেহ আছে। যে চার পার্সেন্ট সুদে এই ঋণের কথা বলা হয়েছে তাতে সরকারের ভর্তুকি থাকলেও ব্যাংকগুলো এত কম সুদে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। এনজিও বা দরিদ্রদের নিয়ে কাজ করে এমন ব্যাংকগুলো এই ঋণ প্রদানে আগ্রহী নয়। একদিকে ক্ষুদ্র বলে তাদের ঋণ দিতে মাথাপিছু খরচ বেশি হয় ব্যাংকগুলোর, অন্যদিকে সুদের হার কম বলে ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে ব্যাংকগুলো এই ঋণ বিতরণে আগ্রহ প্রকাশ করছে না। তাই জাতীয় আগামী অর্থবছরে বাজেটে এই ঋণের বিপরীতে প্রদেয় সুদের ওপর সরকারের ভর্তুকি বাড়াতে হবে।
অণু পর্যায়ের যেসব ব্যবসায়ী আছেন, এমনকি যারা বিভিন্ন জিনিস ফেরি করে বিক্রি করেন, তাদের কাছে ক্ষুদ্র পুঁজি পৌঁছাতে নগর এবং পল্লী অঞ্চলের এনজিও, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন এদের মাধ্যমে উদ্যোগ নিতে হবে। তাই সরকারের বিশেষ বরাদ্দের অর্থ দ্রুত পৌঁছাতে হবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি অতি সহজ শর্তে ঋণ পৌঁছানোর উদ্যোগও থাকতে হবে। অণু, ক্ষুদ্রশিল্প উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য টেম্পোরারি ওভারড্রাফট বা অগ্রিম চেক প্রদানের বিনিময়ে প্রণোদনার অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে এসব ব্যবসায়ীর সংগঠনগুলো ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক যখন তার ঋণগ্রহীতার অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইবে তখন এই অ্যাসোসিয়েশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাছাড়া ক্রেডিট হোলসেলিং বা একত্রে কয়েকজনকে মিলে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগও কার্যকর হতে পারে। মোবাইলভিত্তিক বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণসহায়তা দিতে বিশেষ ফান্ডের কথা ভাবা যেতে পারে।
দেশের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদন, জীবিকা বাঁচিয়ে রাখতে হলে এবং তাদের সঙ্গে নিযুক্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবিকা রাখতে হলে তাদের পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থনীতির চলমান সংকট কতদিন চলবে তা আমরা জানি না। কিন্তু মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাদের কর্মসংস্থান থাকতে হবে, জীবিকা থাকতে হবে। একথা মানতে হবে যে, যতদিন পর্যন্ত কভিড-১৯ ভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার না হয় অথবা কার্যকর কোনো ওষুধ না আবিষ্কার হয়, ততদিন পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা জীবনযাত্রা কোনো কিছুই স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরবে না। বিল গেটসের মতে, সেই পরিস্থিতি আসতে ৯ মাস থেকে দুবছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। তবে আমরা এটা বুঝি যে, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যদি ভালো হতো, যদি আমরা বিপুলসংখ্যক করোনা টেস্ট প্রতিদিন দেশের আনাচে-কানাচে সর্বত্র করতে পারতাম, তাহলে হয়তো আমাদের আশঙ্কা কম হতো। অথবা আমাদের যদি সক্ষমতা থাকত সব মানুষকে ঘরে রেখে আগামী অন্তত দুমাস মানুষের খাদ্য, বাড়িভাড়া, ইত্যাদি প্রয়োজন মেটানোর, তাহলে হয়তো সবাইকে ঘরে রাখা সম্ভব হতো। আমাদের সে সক্ষমতা নেই। প্রতিদিন মানুষের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে। কর্মহীন নিম্নমধ্যবিত্ত, এমনকি মধ্যবিত্তও এখন জীবিকা নিয়ে চিন্তিত। এই অবস্থায় কৃষির পাশাপাশি অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের শিল্প এবং ব্যবসায়ীরাই হতে পারেন আমাদের জীবন ও জীবিকার ভারসাম্যের মূল হাতিয়ার। তাই এদের কাছে পুঁজি পৌঁছানোর উদ্যোগ হতে হবে ব্যাপক।
পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে অনলাইন ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম সৃষ্টি ও তাদের সক্রিয় রাখতে সহায়তা দিতে হবে। ইন্টারনেট খরচ কমানোর জন্য এই সংক্রান্ত কর কমাতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাদের প্রতিষ্ঠানে যেন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারেন তার জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর অবকাঠামো তৈরিতে প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর কমাতে হবে এবং তা সহজলভ্য করতে বাজেটে উদ্যোগ থাকতে হবে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিপুলসংখ্যক টেস্ট করার সুযোগ, তার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন খাতের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে কর্মকাণ্ড চালানোর বিস্তারিত পরিকল্পনা এই বিষয়গুলোর ওপরই নির্ভর করবে আমরা কম ক্ষতিতে অর্থনৈতিক কাজ কতটা শুরু করতে পারব। তাই শুধু মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নয় জীবিকার নিরাপত্তার জন্য স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বাড়ানো এবং তার গুণগত মান উন্নয়ন করা দরকার।
নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য বাজেটে বরাদ্দ থাকতে হবে। এক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের বাস্তবতায় নানা রকম অনলাইন ব্যবসা, তার সঙ্গে সংযুক্ত ডেলিভারির বা সরবরাহ সংক্রান্ত ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতিতে উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে প্রাধান্য দিতে হবে। পাশাপাশি এই সংক্রান্ত দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের বরাদ্দ থাকতে হবে। সময়ের প্রয়োজনে অনলাইন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিল্প এবং বাণিজ্যে নারীউদ্যোক্তাদের কথা ভুলে গেলে চলবে না। সরকারের দুই হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার ৫ পার্সেন্ট অর্থাৎ এক হাজার কোটি টাকা নারীদের পাওয়ার কথা এই সংক্রান্ত শুধু বাজেট বরাদ্দে কাজ হবে না বরং ঋণ দেওয়ার শর্তকে অতি সহজ করতে হবে। ব্যাংকগুলো এমনিতেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে না, সেখানে নারীউদ্যোক্তাদের প্রতি অবহেলা আরও বেশি।
২০২০-২১ অর্থবছরে অর্থনীতির হাল ধরে থেকে টিকে থাকার যে বাজেট তাতে অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের ওপর ভর করে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে মনোযোগ দেওয়াটা এখন সময়ের দাবি। আমরা যখন জীবন-জীবিকার ভারসাম্য রক্ষা করতে চাই এই দুটো যেন পাশাপাশি হাত ধরে চলতে পারে সেটা চাই, তখন চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অণু ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে সহযোগিতা এই দুয়ের সমন্বয় হবে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার মূল চালিকাশক্তি।
লেখক
সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, বিআইডিএস
nazneen7ahmed@yahoo.com