প্রতীকী ধ্বংসের ডাক বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন

ইংল্যান্ডে বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ১৭ শতকের দাস ব্যবসায়ীর ভাস্কর্য টেনে নামিয়ে সাগরের গভীর পানিতে ফেলে দেওয়ার মধ্যেই বক্তব্য পরিষ্কার করা হয়েছিল। একটা পরিবর্তন আসছে এই ইঙ্গিতটা ধরতে খুব একটা সময় লাগেনি যুক্তরাজ্য সরকারের। বুঝেও অভিজাততন্ত্রের সুবিধাভোগী অবস্থান থেকে গত রবিবার বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয় সরকার। কিন্তু যতই মামলা হোক না কেন ক্লস্টনের ভাস্কর্য রাখার স্থানে বিজয়োল্লাস করে ছবি তোলা আর একটা আসন্ন পরিবর্তনের বার্তা দিতে ভুল করেনি বিক্ষোভকারীরা।

ঐতিহাসিক ডেভিড অলুসোগা বিবিসিকে বলেন, ‘ভাস্কর্যগুলোর বক্তব্য আসলে এমন যে এই মহান মানুষগুলো সমাজের জন্য অনেক কিছু করেছেন। কিন্তু এই কথা তো সত্যি নয়। তিনি ছিলেন একজন দাস ব্যবসায়ী, একজন হত্যাকারী।’ ব্রিস্টলের ওই আঘাতের অনুরণন উপনিবেশের আওতায় থাকা অনেক দেশকে প্রকম্পিত করেছে। স্কটিশ রাজধানী এডিনবার্গে প্রায় ১৫০ ফুট দীর্ঘ মেলভিল মনুমেন্টের চেহারাই পাল্টে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। হেনরি ডান্ডাস নামে এক প্রভাবশালী রাজনীতিকের নামে ওই মনুমেন্ট ১৮২৩ সালে নির্মিত হয়। ১৯ শতকে তাকে বলা হতো মুকুটহীন রাজা। ১৭৯২ সালে দাসপ্রথা বিলোপের একটি আইন তিনি একা বিরোধিতা করে পিছিয়ে দিয়েছিলেন। এর ১৫ বছর পর অবশ্য বিলটি পাস হয়। তার ওই কৃতকর্মের জন্যই মনুমেন্টটিকে রাঙিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা।

বেলজিয়ামকে বলা হয় ভাস্কর্যের দেশ। দেশটির দীর্ঘ সময়ে রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের ভাস্কর্যেও বিক্ষোভকারীরা রং স্প্রে করেছে। অনলাইনে এক পিটিশনে ওই ভাস্কর্য তুলে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সেই পিটিশনে দশ হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর দেয়। কিছু বিক্ষোভকারী শুধু স্বাক্ষরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে লিওপোল্ডের শরীরে ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না’ এই বক্তব্য লিখে দেয়। লিওপোল্ডের অন্য একটি ভাস্কর্যে তো বিক্ষোভকারীরা আগুনই লাগিয়ে দিয়েছে। এই রাজার আমলে বেলজিয়াম দাসেদের শ্রম শিবিরে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল।

লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত অঞ্চল টাওয়ার হ্যামলেটস বারা থেকে ব্রিটিশ দাস ব্যবসায়ী রবার্ট মিলিগানের ভাস্কর্য সরানো হলো ২০০ বছর পর। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গত মঙ্গলবার বিকেলে বারার মেয়র জন বিগসের উপস্থিতিতে ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কি’র মিউজিয়াম অব লন্ডন ডকল্যান্ডসের সামনে থেকে ভাস্কর্যটি সরানো হয়। লন্ডনের মেয়র সাদিক খান সম্প্রতি ঘোষণা দেন, শহরের যেসব ভাস্কর্য আর রাস্তার নামের সঙ্গে দাস ব্যবসার ইতিহাস জড়িয়ে আছে, সেগুলো তিনি পর্যালোচনা করবেন। তিনি বলেছিলেন, দাস ব্যবসার ইতিহাস বহন করে এ রকম সবকিছুই সরিয়ে ফেলা উচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া রাজ্যে মৈত্রী স্থাপনকারী ভাস্কর্য হিসেবে স্থাপিত জেনারেল রবার্ট ই লী’র ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত ১২ টন ওজনের এই মনুমেন্টটি সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন গভর্নর র‌্যালফ নরথ্যাম। তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিহাসের অসত্য দিক আর বহন করতে চাই না। এই ভাস্কর্য এখানে বহুদিন ধরে আছে। কিন্তু এটা আগাগোড়াই ভুল ছিল, তাই আমরা এটাকে সরিয়ে ফেলছি।’ রবার্ট লী ছিল ১৮৬১-১৮৬৫ যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময় দাসপন্থি কনফেডারেট স্টেটস আর্মির কমান্ডার।

দেশে দেশে বিভিন্ন সময় পরিবর্তনের নামে প্রতীকীর ওপর মানুষ তার অব্যর্থ আক্রোশ দেখিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের ভাস্কর্য টেনে নামায় উত্তেজিত জনতা। তারা ভাস্কর্য নামানোর মধ্য দিয়ে একটা নিষ্ঠুর সময়কে পদানত করতে চেয়েছিল। যেমনটা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিভিন্ন স্থানে ভøাদিমির লেনিনসহ অনেক কমিউনিস্ট নেতার ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। যুগে যুগে ইতিহাসের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এমনটা হয়েছে।