দক্ষিণ আফ্রিকা আবার বিশ্বকাপ খেলবে কবে?

দক্ষিণ আফ্রিকায় ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল ১১ জুন ২০১০-এ। আজ থেকে ঠিক ১০ বছর আগে।

রংধনুর দেশে প্রথম বিশ্বকাপ বললেই কী মনে পড়ে? জঙ্গল, জিরাফ আর জেব্রা, নাকি ভুভুজেলা? অবশ্য কেউ বলতে পারেন ২০১০ সালের বিশ্বকাপকে এটুকুর মধ্যে বাঁধা যায় না। স্পেনের ‘তিকিতাকা’ ছিল। ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গানের সঙ্গে লাস্যময়ী শাকিরার নাচ ছিল। আর ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা।

২০১০-এ দক্ষিণ আফ্রিকা ফুটবল বিশ্বকাপের প্রস্তুতি পর্বে, কৃষ্ণাঙ্গদের লড়াইয়ের কথা বলতে বলতে বারবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন ম্যান্ডেলা। সাম্রাজ্যবাদী শে^তাঙ্গদের বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গদের সেই লড়াইয়ে অস্ত্র ছিল ফুটবল। নাম জড়িয়েছিল মহাত্মা গান্ধীর। আফ্রিকার বিশ্বকাপ নিয়ে ফিফার ওয়েবসাইটে সেই সময় প্রকাশিত একটি নিবন্ধের শিরোনাম ছিলÑ ‘মহাত্মা গান্ধী, ফুটবল লিজেন্ড’। কালো মানুষের মুক্তিতে মহাত্মা গান্ধীর অবদান নিয়ে তৈরি লেখাটি। হ্যাঁ, গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় শুধু আইন ব্যবসা করেননি, ফুটবলও খেলেছেন। তিন তিনটি ক্লাবও চালিয়েছেন।

তরুণ ব্যারিস্টার মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ১৮৯৩ সালের মে মাসে পৌঁছান ডারবানে। ক্লায়েন্টদের সাহায্য করতে গিয়েই পরিচয় হয় চেন্নাইয়ের এক খ্রিস্টান পরিবারের সন্তান হেনরি পলের সঙ্গে। নাটালে খুব প্রভাবশালী ছিলেন হেনরি।

উনিশ শতকের গোড়ায় ভারতীয়দের বাণিজ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার পাঁয়তারা শুরু করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকার শে^তাঙ্গ শাসকরা। অমানবিক বৈষম্য আর জাতিবিদ্বেষী আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য নাটালে ভারতীয় কংগ্রেসের একটি শাখা প্রতিষ্ঠা করেন মহাত্মা গান্ধী এবং হেনরি পলের অনুরোধে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য গড়ে তোলেন আফ্রিকার প্রথম ফুটবল সংস্থা ‘ট্রান্সভাল ইন্ডিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন’। তিনটি ফুটবল ক্লাবও তৈরি করেন। ডারবানের ফিনিক্স ফার্ম, জোহানেসবার্গের টলস্টয় ফার্ম এবং প্রিটোরিয়া শহর ছিল ক্লাব তিনটির ঠিকানা। নাম একটিইÑ প্যাসিভ রেজিস্টার্স সকার ক্লাব। ১৯০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন’ নামে একটা পত্রিকাও বের করেছিলেন গান্ধী। যেখানে ফুটবলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। ১৯০৪ সালের ১০ অক্টোবর ‘অ্যান এঞ্জিন অব অপ্রেশন’ শিরোনামে এক সম্পাদকীয়ও লেখেন। গান্ধী লিখেছিলেন, ‘ট্রান্সভালে ভারতীয়দের যাতায়াতে বাধা প্রদানের সীমা দিন দিন বারছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রজা হোক বা না-ই হোক, শুধু গায়ের চামড়া সাদা হলেই যাবতীয় সুযোগ সুবিধার অবাধ আয়োজন

থাকবেÑ এ কেমন কথা। অথচ শরণার্থীর বৈধ নথিপত্র পেশ করা সত্ত্বেও প্লেগ সংক্রমণের ছুতোয় নাটাল, কেপটাউন আর ডেলাগোয়াÑ সর্বত্রই কৃষ্ণাঙ্গ ও ভারতীয়দের ওপর নিপীড়ন করা হচ্ছে। কিম্বারলি ও ডারবানের দুটি ফুটবল দলকে অন্যায়ভাবে আটকে দেওয়াকে কেন্দ্র করে এই দমননীতি সবচেয়ে কদর্য রূপ ধারণ করেছে। ব্রিটিশ ভারতীয় একটি ফুটবল দলকে না আটকানোর কী আছে, তা নাকি ভারপ্রাপ্ত প্রধান সচিব বুঝেই উঠতে পারছেন না! ফুটবল খেলাটা যে আদতে ব্রিটিশদেরই জিনিস সেটা ভুলে গিয়ে মিস্টার রবিনসন কিনা ফুটবলকেই গালমন্দ করছেন! সর্বোচ্চ প্রশাসনিক মহল থেকে ভারতীয় ফুটবল দলটিকে যতই সম্মান জানানো হোক, ট্রান্সভালের কর্র্তৃপক্ষ হয়তো সেই মধ্যযুগেই পড়ে থাকবে।’

আন্দোলন এবং লেখালেখির পাশাপাশি ‘ট্রান্সভাল ইন্ডিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও দাঁড়িয়েছিলেন গান্ধী। হেরেছিলেন ১০-২৩ ভোটে। হারলেও তাকে ১৯১২ সালের মে মাসে নাটালের ফুটবল সংস্থার পেট্রন করা হয়েছিল! ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকা ফুটবল বিশ্বকাপের প্রস্তুতি পর্বে এই লড়াইয়ের কথাই বলতেন।

গান্ধীর প্যাসিভ রেঞ্জার্স ১৯১০ সালেই শে^তাঙ্গদের ‘জোহানেসবার্গ রেঞ্জার্স’কে হারিয়ে দিয়েছিল। এই সাফল্যে উদ্বেল হয়েছিলেন আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গরা। পরে আরও সাফল্য পেয়েছিল প্যাসিভ রেঞ্জার্স। সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে অভিজাত টুর্নামেন্ট ছিল ‘স্যাম চায়না কাপ’। ১৯১১ থেকে ১৯১৩ পর্যন্ত এই কাপে দারুণ খেলেছিল গান্ধীর দল।

দক্ষিণ আফ্রিকার সেরা ফুটবলার জোমো সোনোনামরা এই লড়াইয়ের উত্তরাধিকার বহন করছেন। এক সময় পেলে, বেকেনবাওয়ারের সতীর্থ। কসমসে খেলেছেন অনেক দিন। বর্ণবিদ্বেষের কারণে হয়তো আন্তর্জাতিক ফুটবলে পরিচিতি পাননি। জোমোর ছেলেও খেলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকা জাতীয় দলে। বিশ্বকাপে খেলা বামুজা, ম্যাকডোনাল্ড মুকান্সি বা মার্ক ফিশ, মাসিঙ্গারা তার হাতে গড়া। কোচ হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আফ্রিকান ন্যাশনস কাপেও তুলেছিলেন। তবে সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। বিশ্বকাপের জন্য ডারবান, কেপটাউনে অসাধারণ স্টেডিয়াম তৈরি হলেও তারকা ফুটবলার তৈরি করতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। তাই ২০১০ সালের পর আর বিশ্বকাপও খেলতে পারেনি তারা। কবে পারবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।