কয়রায় অধিকাংশ এলাকা লোনাপানিতে সয়লাব

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ২ হাজার অন্তঃসত্ত্বা, ২০ হাজার শিশু

খুলনার কয়রা উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে বাঁধ ভেঙে ঢোকা নোনাপানির কারণে অধিকাংশ মানুষ দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে ১ হাজার ৮৮৩ জন অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রায় ২০ হাজার শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা হুমকির মুখে পড়েছে। প্রয়োজনীয় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, চলতি বছরের ২০ মে আম্পানের তা-বে বাঁধ, ঘরবাড়ি তছনছ হয়ে যায়। দক্ষিণ বেদকাশি, উত্তর বেদকাশি, কয়রা সদর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের ৪২টি গ্রাম সম্পূর্ণ এবং আরও ২টি ইউনিয়নের ২৪টি গ্রাম আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২১টি স্থানে বাঁধ ভেঙে লোনাপানি ঢোকে। ৫১ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখনো উপজেলার অধিকাংশ এলাকা থেকে লোনাপানি নামেনি।

উত্তর বেদকাশির হাজতখালী এলাকার অন্তঃসত্ত্বা রাবেয়া খাতুন রক্তশূন্যতায় ভুগছেন। তিনি বলেন, ‘নোনাপানিতে ঘরবাড়ি হারিয়ে বেড়িবাঁধের ওপর খুপড়ি ঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আছি। দিনে একবেলা খেয়ে বেঁচে রয়েছি, অনাগত সন্তানের জন্য। ডাক্তার রক্ত নিতে বললেও রক্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এলাকায় চলচলের রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি, কমিউনিটি ক্লিনিক সবখানেই পানি। ঘর থেকে বাইরে যেতে হলে নৌকা অথবা ভেলার প্রয়োজন। সেখানে স্বাস্থ্যকর্মীদের পৌঁছানো কঠিন। যে কারণে চাইলেও দুর্গত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। উপজেলা সদর থেকে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় উত্তর ও দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়ন দুটিতে নৌকায় করে যাতায়াত করতে হচ্ছে। ওইসব এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।

তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুদীপ বালা বলেন, উপজেলায় ১ হাজার ৮৮৩ জন অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ২০ হাজার শিশু রয়েছে। কাদাপানি পার হয়ে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ সেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।

এদিকে নদীর রিংবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গত ২ জুন থেকে প্রতিদিন জোয়ারের সময় প্লাবিত হচ্ছে উপজেলার অধিকাংশ এলাকা।

কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, উপজেলা সদর এখন পানিতে থই থই করছে। খাদ্য সংকট আর লবণ পানির চাপ সামলাতে মানুষ হিমশিম খাচ্ছে।

কয়রা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, জনগণ বেঁচে থাকার তাগিদে নিজ উদ্যোগে কয়রার বাঁধ নির্মাণ করে। কিন্তু সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণে পদক্ষেপ নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। পাউবোর কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

পাউবো কয়রার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মশিউল আবেদিন বলেন, লোনাপানি উত্তোলন করে বেড়িবাঁধের পাশে ঘের করা বেড়িবাঁধে ভাঙনের প্রধান কারণ। আমরা কয়েকবার প্রশাসনের সহায়তায় বেড়িবাঁধ থেকে অবৈধ পাইপ অপসারণ করেছি। কিন্তু পরে তারা আবার তা স্থাপন করে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বলেন, টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। নোনাপানির দুর্যোগকালীন মুহূর্তে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।