পড়শিদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে দিল্লির

চীন সীমান্তে সংঘাত, পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের চলমান বিবাদে জড়িয়ে থাকা ভারতের নিত্যদিনের বিষয়। তবে সাম্প্রতিক চীন সীমান্তে সংঘাতে হতাহতের ঘটনা ও নেপালের নতুন মানচিত্র ইস্যু দেশটিকে কিছুটা চাপে ফেলেছে। এছাড়া এনআরসি ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক শীতলতায় প্রায় বছরখানেক ধরে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের বৈরিতায় পড়েছে দিল্লি। আর এ জন্য তারা প্রশ্ন তুলেছেন ভারত সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও। আরেকটি বিষয় নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। ২০১৯ সালে পাকিস্তানের বালাকোটে ভারতীয় বিমানবাহিনী ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ করলেও লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় চীনা সেনাবাহিনীর অগ্রসর হওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন চুপ করে থেকে সরকার।

এদিকে যে সময়ে চীনের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় সৈন্য নিহত হলেন সেই সময়েই বুধবার নেপালের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে সে দেশের নতুন ম্যাপ সর্বসম্মতিক্রমে পাস হলো, যাতে ভারতের কিছুটা অংশও রয়েছে বলে নয়াদিল্লির অভিযোগ। নেপালের মতো ভারতের বন্ধু রাষ্ট্রও এখন কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। এর আগে বাংলাদেশের তিনজন মন্ত্রী ভারত সফর বাতিল করেছিলেন এমন একটা সময়ে, যখন বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের সংখ্যালঘুদের নিজেদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য নতুন আইন করেছিল ভারত। যদিও ওই আইন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বারবারই বলেছে যে, আইনটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

এই ঘটনাগুলো থেকেই প্রশ্ন উঠছে যে, কেন গত কয়েক বছর ধরে নিকটতম প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে?

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অশ্বিনী রায় বলছিলেন, এই অঞ্চলের প্রতিটা দেশই বোঝে যে চীন-ভারত সম্পর্কের ওপরই নির্ভর করছে তারা নিজেরা কতটা স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারবে। তিনি বলেন, ‘নেপাল এই সুযোগটা আগে থেকেই নিয়েছে। এখন আরও বেশি করে সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে।’

নেপালের মতে, নতুন মানচিত্রের ভিত্তি হচ্ছে ১৮১৬ সালের সুগাউলি চুক্তি। কিন্তু ভারত সেই দাবি নাকচ করে দিয়ে আসছে। মে মাসের মাঝামাঝিতে বিতর্কিত ভূখণ্ড কালাপানি আর লিপুলেখকে নিজেদের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নেপাল সরকার।

বিশ্লেষকরা যেমন একদিকে চীনের উচ্চাকাক্সক্ষা এবং দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট হওয়ার কথা বলছেন, তেমনই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও দোষ দিচ্ছেন নিকটতম প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতির জন্য। নিকটতম প্রতিবেশীদের কাছে কি ভারতের সম্পর্কে একটা নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে দেশের ভেতরে উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এমন প্রশ্নের জবাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমন কল্যাণ লাহিড়ী বলেন,  যেসব আইন নানা সময়ে ভারতে পাস করা হচ্ছে, সেগুলো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ভালোভাবে নিচ্ছে না। ভারত একটা সময়ে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে ছিল, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে সে রকম একটা দেশের কাছে প্রতিবেশীরা এ ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদী আইন আশা করে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিটি দেশের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা চালাতে হবে ভারতকে। আর ভারতের সাধারণ মানুষ আর রাজনৈতিক নেতাদের একাংশ যে ‘যুদ্ধং দেহি’ মনোভাব নিয়ে চলতে শুরু করেছে, ভারতকে সেই সামরিক সমাধানের পথে না হেঁটে কাজে লাগাতে হবে কূটনীতিকে।