করোনাকালে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসী আয়ের ওপর আঘাত নেমে এসেছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ হারিয়ে দেশে ফিরেছেন। অনেকে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার হারানোর শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এ ধরনের শঙ্কা যে অমূলক নয়, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ‘ফেরত আসতে পারে দুই লাখ সৌদি প্রবাসী শ্রমিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি থেকে জানা গেছে, করোনার কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি সরকার চলতি বছরের শেষ নাগাদ ১২ লাখ অভিবাসী শ্রমিককে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মধ্যে প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশি।
সৌদি আরবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার রয়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার বাংলাদেশি কাজের জন্য বিভিন্ন দেশে গেছেন। এর মধ্যে ৯৫ হাজার ৩৮৪ জনই গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। দেশটিতে প্রায় ২১ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক বিভিন্ন পেশায় কর্মরত।
সৌদি আরবের ২০৩০ ভিশন অনুযায়ী, পুরো সৌদির শ্রমবাজারে ৭০ শতাংশ সৌদি আরবের নাগরিককে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির। এটি বাস্তবায়নে সব দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের ক্রমান্বয়ে ছাঁটাই করে নিজ দেশে ফেরত পাঠাবে সৌদি সরকার। এ পরিস্থিতিতে গত বছরের শেষ দিক থেকে সৌদিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস পাসপোর্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ, হুরুব হয়ে যাওয়া, অবৈধ হয়ে যাওয়া অনিবন্ধিত বাংলাদেশিদের তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু করে। দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ভাগ করে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বাংলাদেশিদের নিবন্ধনের আহ্বান জানানো হয়। তখন থেকেই সৌদিতে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেট প্রতিনিয়ত এসব বাংলাদেশির তালিকা প্রণয়নে কাজ করছে। সৌদি আরব বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে। শুরুতে অবৈধ ও আনডকুমেন্টেড বাংলাদেশিদের নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। এরপর বৈধভাবে থাকা বাংলাদেশিদেরও ফেরত নেওয়ার শঙ্কা রয়েছে বলে মতপ্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
সৌদি আরবের অর্থনীতি মূলত তেল ও হজনির্ভর। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখন সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে এসেছে। তাই গত এপ্রিলে তেলের উৎপাদন কমিয়ে দেয় দেশটি। মজুদ রাখার পর্যাপ্ত স্থান না থাকায় পানির দরে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে তারা। এতে অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগে নির্মাণাধীন উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের কাজও থমকে গেছে। যার বড় প্রভাব পড়েছে অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর। অধিকাংশ কোম্পানিই শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করছে না। কিছু কিছু কোম্পানি শ্রমিকদের শুধু খাওয়ার খরচ বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দেশটিতে থাকা শ্রমিকরা মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। সৌদিতে কর্মরত বাংলাদেশের শ্রমিকরাও একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। এ ছাড়া এ বছর হজ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় সেখান থেকে আয়ের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে সৌদি প্রবাসী শ্রমিকদের।
শুধু মানবেতর জীবনযাপনই নয়, বাংলাদেশি শ্রমিকরা সৌদিতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্য দিয়ে দিন অতিক্রম করছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সৌদিতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখের মতো। গত বুধবার পর্যন্ত দেশটিতে মারা গেছেন ১ হাজার ৯৫ জন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা ৩৫৩ জন। জানা গেছে, দেশটিতে করোনায় বিদেশিদের মধ্যে বাংলাদেশিরা বেশি মারা গেছেন। এমতাবস্থায় তারা যে দেশে ফিরবেন, সেখানে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়েছে বিমানভাড়া। স্বাভাবিক সময়ে দেশে আসা-যাওয়ার টিকিট খরচ পড়ত ৩০-৪০ হাজার টাকা। করোনা সংকটের মধ্যে শুধু ফেরার জন্য বিমানভাড়া দ্বিগুণ ধরে ন্যূনতম ৬০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। আজ বিশ্বজনীন করোনা মহামারীর এই সংকটকালে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি অবশ্যই অগ্রাধিকার দাবি করে। বিশেষ করে সৌদিতে কর্মরত শ্রমিকদের এরকম মানবেতর অবস্থায় তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এক্ষেত্রে যাতে সৌদিতে শ্রমবাজার সংকুচিত না হয় সেজন্য উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা অবশ্যই কাম্য। পাশাপাশি শ্রমিকদের সুরক্ষায় সৌদিতে বাংলাদেশের দূতাবাসকে ভূমিকা নিতে হবে। যারা ফিরে আসছেন তাদের স্বাস্থ্যসহ সকল নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দেশে ফিরে তাদের কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে ‘প্রবাসী কল্যাণ ফান্ড’ থেকে সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। সর্বোপরি, দেশের বৃহৎ শ্রমবাজার সংকুচিত না হতে দেওয়া এবং প্রবাসী শ্রমিকদের বিপদে সর্বাত্মক সহযোগিতার বিকল্প নেই।