১৯৯৬-এর ২২ জুন। সৌরভ গাঙ্গুলির টেস্ট অভিষেক হয়েছে দুদিন আগে। ক্যারিয়ারের তৃতীয় দিনেই লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নাম তুললেন প্রিন্স অব ক্যালকাটা। আজ সেই অভিষেক সেঞ্চুরির ২৪তম বার্ষিকী।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন নম্বরে নেমে সেদিন ১৩১ করেছিলেন সৌরভ। খেলেছিলেন ৩০১ বল। সেই টেস্টে অভিষেক হয়েছিল রাহুল দ্রাবিড়েরও। মাত্র ৫ রানের জন্য সেঞ্চুরি বঞ্চিত হন। সৌরভের সেঞ্চুরির সময় উইকেটে ছিলেন দ্রাবিড়। সেই অভিজ্ঞতা বলেন তিনি, ‘সৌরভ নেমেছিল ৩-এ। আমি ৭-এ। তাই অনেক সময় পেয়েছিলাম সৌরভের ব্যাটিং দেখার। ও খুব ভালো ব্যাট করছিল। ও সেঞ্চুরি পাওয়ায় খুব খুশি হয়েছিলাম।’ জীবনের প্রথম টেস্ট ইনিংসে সৌরভের ২০টি বাউন্ডারি হাঁকানো দেখে দ্রাবিড়ের মনে হয়েছিল, ‘আমিও তো তাহলে কিছু করতে পারি। সুযোগটা কাজে লাগাতে পারি। সৌরভের ওই সেঞ্চুরি থেকে আমি প্রেরণা খুঁজে পেয়েছিলাম।’
নিজের ইনিংসটা সম্পর্কে সৌরভ বলেন, ‘ব্যাটিংয়ে ডুবে ছিলাম। দ্রাবিড় যখন ব্যাট করতে আসে, আমি তখন ৭০ রানে। যে শটে আমি সেঞ্চুরি পেয়েছিলাম, তা এখনো মনে আছে। ওটা ছিল পয়েন্ট অঞ্চল দিয়ে মারা একটা ড্রাইভ। দ্রাবিড় ওই সময় নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে ছিল। আমি চা বিরতির ঘণ্টাখানেক পরে আউট হয়ে যাই। ও ব্যাটিং চালিয়ে যায়।’ দ্রাবিড় সেঞ্চুরি বঞ্চিত হওয়ায় দুঃখ পেয়েছিলেন সৌরভ, ‘পরের সকালে ওর সেঞ্চুরি দেখার আশায় লর্ডসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ইডেনে দ্রাবিড়ের অভিষেক (ওয়ানডে) দেখেছি। আর তারপরে লর্ডসে। সত্যি যদি লর্ডসে সেদিন দুজনেই সেঞ্চুরি পেতাম, তা হলে দারুণ হতো।’ লর্ডসে স্বপ্নের অভিষেকের পর সৌরভ ১১৩ টেস্ট খেলে ৭২১২ রান করেন। দ্রাবিড় ১৬৪ টেস্টে করেন ১৩,২৮৮ রান।
টেস্ট অভিষেকের ৪ বছর আগে ভারতীয় দলে সুযোগ পান সৌরভ। ওয়ানডে অভিষেক ১৯৯২ সালে অস্ট্রেলিয়ায়। প্রতিপক্ষ ছিল উইন্ডিজ। এরপর চার বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে ছিলেন সৌরভ। ৯৬-র ইংল্যান্ড সফরের প্রথম টেস্টে জায়গা পাননি। সঞ্জয় মাঞ্জরেকার ইনজুরিতে পড়ায় লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টে সুযোগ পেয়েই বাজিমাত। তার সম্পর্কে মাঞ্জরেকার বলেন, ‘সফরে ২/৩ ম্যাচ হতে না হতে আলোচনা বদলে গেল। সৌরভ তখন আস্তে আস্তে গুটিপোকা থেকে ক্রমে ডানা মেলছে। বলটা দেরিতে খেলছিল। শেষ পর্যন্ত দেখে ছাড়ছিল। সিম বোলিংয়ের বিরুদ্ধে কোনো অস্বচ্ছন্দে ভুগছিল না। মনেই হচ্ছিল বড় রান করা শুধু সময়ের অপেক্ষা।’
অথচ এই মাঞ্জরেকারের ৯২-এর সৌরভকে দেখে লম্বা রেসের ঘোড়া মনে হয়নি। সেই সফরে দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে পানি নিতে অস্বীকার করে সমালোচিত হয়েছিলেন সৌরভ। আত্মজীবনীতে মাঞ্জরেকার লিখেছেন, ’৯২-এর সফরে সৌরভের রুমমেট ছিল দিলিপ ভেংসরকার। তত দিনে দিলিপের একশো টেস্ট ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে। অধিনায়কত্বও করেছেন। অথচ আমরা গল্প শুনতাম, রুমে সৌরভ নাকি ছিল বক্তা, আর শ্রোতা ছিল দিলিপ। পুরো সফর জুড়েই তাই। এ রকম জুনিয়রকে আমরা আগে কখনো দেখিনি। ভারতীয় ড্রেসিং রুমে জুনিয়র বলতে বোঝায়, একটু নরম, বিনীত, কম কথার, লাজুক প্রোটোটাইপ। অথচ সৌরভ ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। লজ্জা-টজ্জার কোনো ব্যাপার নেই। প্রথম দিন থেকে কনফিডেন্ট। মনের কথা খুলে বলে। সব সময় নিজস্ব পয়েন্ট অব ভিউ রয়েছে।’ সৌরভের এই আচরণে অনেকেই ক্ষুব্ধ ছিলেন। সেজন্যই ওয়ানডে অভিষেকের পর লম্বা সময়ের জন্য বাদ পড়া।
অভিষেকে সেঞ্চুরির পর মাঞ্জরেকার বলেছিলেন, ‘সৌরভের ইনিংস ভারতীয় ড্রেসিংরুমে তার জন্য রেসপেক্ট তৈরি করেছিল। লর্ডস ব্যালকনির সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে যারা গাঙ্গুলিকে চিয়ার করছিল তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। টেন্টব্রিজে ওর দ্বিতীয় সেঞ্চুরিটা ছিল লর্ডস টেস্টেরই এক্সটেনশন। যেন অনিবার্যই ছিল। ওর দুই সেঞ্চুরি আমাদের অবাক করে দেয়। সে সময় একটা ছেলে বিদেশে জীবনের প্রথম দুই টেস্টে দুটি সেঞ্চুরি করেছে! ভাবাই যেত না। আমার তো মনে হয় আজহারের জীবনের প্রথম তিন টেস্টে তিনটে সেঞ্চুরির চেয়ে জোড়া টেস্টে সৌরভের জোড়া সেঞ্চুরি কোনো অংশে কম নয়।’
৯৬-র ইংল্যান্ড সফর সৌরভের জীবনে সাফল্যের ট্রেলার। পরে তিনি ভারতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে সংস্কারকের ভূমিকা নিয়ে সফল হয়েছিলেন। এখন বিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও নতুন পথ দেখাচ্ছেন। মাঞ্জরেকার ঠিকই লিখেছেন, ‘সৌরভ ওর প্রতিভার সঙ্গে টেম্পারামেন্ট আর লড়িয়ে মানসিকতা মিশিয়ে যা অর্জন করেছে, আমরা সেটা ভাবতেই পারিনি। স্বীকার করি, (অস্ট্রেলিয়া সফরে) ওর কনফিডেন্সটা ভুল করে অ্যারোগেন্সের ছোঁয়া মনে হয়েছিল। সৌরভকে আসলে আমরা চব্বিশ বছর আগে বুঝতেই পারিনি।’