করোনার প্রভাবে বন্ধ হয়ে যায় মোস্তফার (৪০) রিকশা চালানো। ঢাকা থেকে ফিরে আসতে হয় বাড়িতে। অভাব, নেশা আর হতাশায় মোস্তফা সিদ্ধান্ত নেন ভ্যান ছিনতাইয়ের। অবশেষে পুরোনো বন্ধু মিজানুরকে হত্যা করে ছিনতাই করেন ভ্যান।
কিন্তু হত্যার সময় মোস্তফার পকেট থেকে পড়ে যায় মুঠোফোন। লাশের পাশ থেকে খুঁজে পাওয়া সেই মুঠোফোনের সূত্র ধরেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে মোস্তফাকে। রহস্য উন্মোচিত হয় ভ্যান চালক মিজানুরের হত্যাকাণ্ডের
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানা সূত্রে জানা যায়, গতকাল সোমবার বিকেলে দিনাজপুর আমলি আদালত-৬ এর জ্যেষ্ঠ বিচারক মো. মনিরুজ্জামান সরকারের কাছে মিজানুরকে হত্যার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন মোস্তফা।
মোস্তফা রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার শিতলগাছি গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে।
গত ১৬ জুন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের পুলবান্ধা এলাকায় একটি মাঠের জঙ্গলে মিজানুরের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত মিজানুর ফুলবাড়ী উপজেলার তেতুলিয়া গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে।
নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অশোক কুমার চৌহান জানান, গত ১৫ জুন সোমবার সকালে অসুস্থ স্ত্রী আকতারা বেগমের জন্য ওষুধ কেনার কথা বলে বাড়ি থেকে চার্জারভ্যান নিয়ে বের হন মিজানুর। ওই দিন রাতে বাসায় ফেরননি মিজানুর। পরের দিন মঙ্গলবার বিকেলে নবাবগঞ্জ উপজেলার পুলবান্ধা গ্রামে মিজানুরের গলাকাটা লাশ পাওয়া যায়।
লাশ উদ্ধারে গিয়ে পুলিশ সেখান থেকে একটি মুঠোফোন উদ্ধার করে। অনুসন্ধানে দেখা যায় মুঠোফোনটি মোস্তফার। গত শনিবার মোস্তফাকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই সাথে মোস্তফার বাড়ি থেকে মিজানুরের চুরি যাওয়া রিকশাভ্যানটিও উদ্ধার করে পুলিশ।
মোস্তফার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই গ্রামেই তার মামার বাড়ি থেকে মিজানুরকে হত্যায় ব্যবহৃত রক্তমাখা চাকুটিও উদ্ধার করে পুলিশ।
ওসি অশোক কুমার চৌহান জানান, জবানবন্দিতে মোস্তফা জানায়, নিহত মিজানুর এবং মোস্তফা একই সাথে ঢাকায় রিকশা চালাতো। তখন থেকেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বেশ কিছুদিন আগে মিজানুর বাড়িতে চলে এসে রিকশাভ্যান চালানো শুরু করে। মোস্তফা ঢাকাতেই থেকে যায়। করোনার কারণে লকডাউন শুরু হলে মোস্তফাও গত মার্চ মাসে বাড়িতে চলে আসে। মোস্তফা নেশাগ্রস্ত। করোনায় এলাকায় এসে তেমন কাজ না পাওয়ায় অভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে মোস্তফা। নেশা এবং পরিবারের খরচ জোগাড় করতে ভ্যান ছিনতাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সে।
সিদ্ধান্ত মোতাবেক গত ১৫ জুন সকালে ফুলবাড়ী আসে মোস্তফা। বাজার থেকে ৩০ টাকা দিয়ে একটি চাকু কেনে সে। এরপর ফুলবাড়ী রেলগুমটিতে বসে থেকে ছিনতাইয়ের জন্য সুবিধাজনক ভ্যান চালককে খুঁজতে থাকে। এক সময় মিজানুরের দেখা পায় সে। মিজানুরকে নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরতে থাকে। সন্ধ্যার দিকে পাশ্বর্বর্তী বিরামপুর উপজেলার খাঁনপুর ইউনিয়নের ধনতলা গ্রামে এসে দুজনে নেশা করে।
এরপর বৃষ্টি এলে মিজানুরকে নিয়ে চাচার বাড়িতে যাবার কথা বলে নবাবগঞ্জের পুলবান্ধা গ্রামে নিয়ে যায়। সেখানে যবার পথে একটি আমবাগানের পাশে জঙ্গলে কাছে গিয়ে পেছন দিক থেকে চাকু দিয়ে গলা কেটে মিজানুরকে হত্যা করে ভ্যানটি নিয়ে চলে যায় মোস্তফা।
বিরামপুর সার্কেলের এএসপি মিথুন সরকার জানান, মূলত নেশাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অভাবের কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে মোস্তফা। মোস্তফা যে দোকান থেকে চাকু কিনেছে এবং বিরামপুরে যেখানে নেশা করেছে তারা মোস্তফাকে শনাক্ত করেছে।
দিনাজপুর পুলিশ সুপারের সার্বিক দিক নির্দেশনায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যার রহস্য উন্মোচন এবং হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। জবানবন্দির পর মোস্তফাকে গতকাল সন্ধ্যায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।