নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে বরাবরই উদাসীন ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্র্তৃপক্ষ (ঢাকা ওয়াসা)। গত কয়েক বছর ধরে বর্ষায় রাজধানীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার পর সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে খাল খনন, সম্প্রসারণ ও পরিষ্কারের ওপর জোর দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে যেন গা-ছাড়া ভাব সংস্থাটির। রাজধানীর ২৬টি খাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসা এর মধ্যে ১০টি খালে কোনো ধরনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা অন্য কোনো উন্নয়নকাজ করেনি। ফলে এবারও ভারী বর্ষণ হলে রাজধানীর অনেক এলাকার সড়কসহ অলিগলি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তবে ওয়াসার দাবি, তাদের হাতে থাকা অধিকাংশ খালেই কমবেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে বাদবাকি খালে তা সম্ভব হয়নি।
রাজধানী ঢাকার বৃষ্টির পানি মূলত ওয়াসার প্রায় ৩৮৫ কিলোমিটার পানি নিষ্কাশনের বড় নালা, ১০ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট এবং প্রায় ৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ২৬টি খাল দিয়ে নিষ্কাশিত হয়। ওয়াসা বলছে, চলতি অর্থবছরে ২৪টি খাল (৪৮ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার), ৭ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট এবং ৩০০ কিলোমিটার নালা পরিষ্কারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে কিছু কিছু অংশে খাল পরিষ্কার করা হলেও এবার কোনো খাল খনন করা হয়নি। করোনার জন্য নির্ধারিত ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ কেটে নেওয়া হয়েছে বলেও জানান সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলী। তাই ইচ্ছে থাকলে আরও কিছু খালে তারা হাত দিতে পারেনি।
সংস্থাটির ড্রেনেজ (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) সার্কেল থেকে জানা যায়, ‘ঢাকা মহানগরীর ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও খাল উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে ২০১৮ সালের মে মাসে একটি প্রকল্প পাস হয়। প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের আওতায় ১৬টি খালে সব ধরনের উন্নয়নকাজ হওয়ার কথা। কিন্তু প্রকল্পের কাজ এ বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত আশানুরূপ অগ্রগতি নেই। বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানান, চলতি অর্থবছরে এই প্রকল্পের আওতায় ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই টাকায় প্রকল্পের আওতাধীন খালগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে, কয়েকটি পুনঃখননও করা হয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্পের বাইরে থাকা ১০টি খালের মধ্যে হাজারীবাগ, বাইশটেকী, কুর্মিটোলা, মা-া ও বেগুনবাড়ি খালে ভূমি অধিগ্রহণ এবং খনন/পুনঃখননসহ অবশিষ্ট ৫টি খালের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নকাজে তেমন একটা হাত দেওয়া হয়নি।
ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ড্রেনেজ সার্কেল) শওকত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা মহানগরের খাল উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের আওতায় ১৬টি খালে পরিষ্কার ও নানা ধরনের উন্নয়নকাজ করা হয়েছে। বাকি ১০টি খালের মধ্যে ৫টি খালে আমরা একটি প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়নকাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
তবে শুধু খাল পরিষ্কারের মাধ্যমে রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে এই প্রকৌশলী আরও বলেন, ‘ভারী বর্ষণ হলে পানি রাস্তা ও অলিগলি থেকে গড়িয়ে খালে আসতে সময় লাগে। ফলে জলাবদ্ধতা সম্পূর্ণ দূর করতে হলে বৃষ্টির পানি যাতে খালে সহজে আসতে পারে এমন ব্যবস্থা করতে হবে।’
ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ড্রেন ও খাল আমরা সারা বছর পরিষ্কার করে থাকি। কিন্তু সমস্যা হলো একদিক দিয়ে পরিষ্কার করে এলে অন্যদিক দিয়ে ময়লা ফেলে ভরাট করে ফেলা হয়। শক্ত বর্জ্য ফেলে ভরাটের ফলে অনেক সময় খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ থাকে না। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হওয়া দরকার।’ তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শহরের বৃষ্টির পানি সেচের দায়িত্ব ওয়াসার। কিন্তু তারা কাজটি না করে গত কয়েক বছরে শহরের মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলেছে। মেয়রগণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় তাদের দায়দায়িত্ব থেকে এখন জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ হাতে নিচ্ছেন। ওয়াসার বেশ কিছু খালে সিটি করপোরেশন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে। নতুন খাল খননেও হাত দিয়েছে সিটি করপোরেশন। পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে ওয়াসা আরেকটু দায়িত্বশীল হলে নগরবাসীর ভোগান্তি কমবে।’
খাল পরিষ্কারে উদাসীনতার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে কথা বলার আগ্রহ জানিয়ে মেসেজ পাঠানো হলেও তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।