মৌলভীবাজার সরকারী কলেজ ছাত্রশিবির এর সাবেক তুখোড় শিবির নেতা ও শিবিরের সাথী সদস্য এখন মৌলভীবাজারের কিছু আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে মিশে তাদের প্রশ্রয়ে নিজেও সেজেছেন আওয়ামী লীগ নেতা।
সরকার দলীয় নেতাদের প্রশ্রয়ে বিভিন্ন সময় গেছেন মন্ত্রীদের পাশেও। প্রশাসনের সাথে মিশে ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করে নিজেকে প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে পরিচয় দিয়ে তদবির বাণিজ্যেরও অভিযোগ উঠেছে। তিনি কখনো সাংবাদিক, কখনো আওয়ামী লীগ নেতা আবার কখনো সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করছেন বলে অভিযোগ তুলেছে সরকার দলের একটি অংশ। একাডেমিক কাগজপত্রে চৌধুরী না থাকলেও নিজের নামের সাথে যুক্ত করেছেন চৌধুরী।
বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িয়ে ফান্ড কালেকশন করে আত্মসাৎ করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। মৌলভীবাজারের উন্নয়নের নামে হোয়াটস অ্যাপভিত্তিক গ্রুপ খুলে প্রবাসীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে সেই টাকায় নিজের বাড়িতে ঘর বানিয়েছেন এমন অভিযোগও আছে।
বিষয়টি জেনেও দীর্ঘদিন রহস্যজনক কারণে নীরব সরকার দলের একটি অংশ। এর মধ্যে গত ১ সপ্তাহ ধরে তার নানা অপকর্ম প্রকাশ হতে থাকে ফেইসবুকে। অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে শিবিরের কার্যক্রম নীরবে চালিয়ে গেছেন তিনি।
জানা যায়, চৌধুরী মুহাম্মদ মেরাজ নামের এই শিবির নেতার বাড়ি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার চিতলিয়া গ্রামে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মেরাজ চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি কমলগঞ্জ উপজেলার ৬ নম্বর আলিনগর ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে। বর্তমানে শহরের কলিমাবাদে ভাড়া বাসায় থাকেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বরাত দিয়ে জানা যায়, মেরাজের পরিবার জামায়াতের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। মেরাজ চৌধুরীর বড় ভাই জামায়াত-শিবিরের নেতা বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী। অপর ভাই শিক্ষানবিশ আইনজীবী, কমলগঞ্জ উপজেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন। অপর দিকে মেরাজ মৌলভীবাজার শহর শিবিরের সাথী ছিলেন। শিবিরের নেতারাও স্বীকার করেছেন মেরাজ তাদের সক্রিয় কর্মী ছিল।
তাদের অভিযোগ, ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি শিবিরের সক্রিয় নেতা থাকলেও এর পর থেকেই সুযোগ বুঝে দিনে দিনে নিজেকে সরকারি দলের সাথে মিশে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে থাকেন। তিনি অসংখ্যা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে যুক্ত। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের সহযোগিতায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীদের পাশে যাওয়ার সুযোগও পেয়েছেন তিনি। নিয়মিত দেখা যায় প্রশাসনের বিভিন্ন সভায়। ঘুরে বেড়ান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের গাড়িতে করে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ জেলার সরকার দলীয় মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা।
মেরাজের নিজ ইউনিয়ন আলীনগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি ফাহিম আল আহমেদ জানান, মেরাজের সারা পরিবার জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত। এলকায় সে শিবির করত। আমি ছাত্রলীগের সভাপতি হয়ে নেতাদের পাশে যেতে পারি না, তার ছবি বিভিন্ন নেতাদের সাথে দেখে তো আমরা অবাক। চালচলন বেশভূষাও বদলে গেছে দ্রুত। শুধু তার পরিবার নয় তাদের এলাকা পুরাটাই জামায়াতের ঘাঁটি। মৌলভীবাজার জেলার মধ্যে এক গ্রামে এত জামায়াত আর কোথাও নেই ।
লন্ডন প্রবাসী জাহেদ আমদ জানান, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সামনে নির্মিত একটি ওয়াচটাওয়ারের টাইলসে নাম তুলে দেওয়ার কথা বলে তার কাছে ১ লাখ টাকা চায় মেরাজ। আমার জানা মতে সে অনেকের কাছেই এটা চেয়েছে।
তিনি জানান, আমাকে বলে সামান্য জায়গা আছে, অনেকেই নাম লেখাচ্ছেন, আপনি লেখালে আমাকে ১ লাখ দেন আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি । তার কথায় মনে হল সে অন্তত ৪০/৫০ জনের থেকে টাকা নিয়েছে।
সাবেক এক শিবির নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমি নিজেও শিবির করার কারণে জেলে গেছি। মেরাজ একসময় আমাদের সাথে ছিল, রাজনৈতিক অবস্থার কারণে অনেকেই অনেকভাবে নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখছেন সেটা আমাদের কাছে দোষের কিছু নয়। কিন্তু সে যা করেছে তা তার রাজনৈতিক আদর্শের সাথে বেঈমানি। সরকারি দলের নেতাদের সাথে তার তেলবাজি এবং আমাদের কষ্ট দেয়। সে অন্তত ৫০টি সামাজিক সংস্থার সাথে জড়িত। প্রবাসীরা দেশে আসলে ৫০০ টাকা দিয়ে ক্রেস্ট দেয় কিন্তু এর জন্য আদায় করে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।
মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রাসেল জানান আহমদ জানান, জামায়াত-শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নামে এবং সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সরকার দলের নেতদের সাথে ও প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুকৌশলে সখ্যতা গড়ে তুলেছে মেরাজ।
মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আমিরুল ইসলাম চৌধুরী আমিন জানান, সে প্রতারণার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সাথে মিশেছে। আমরা জানতাম না সে ছাত্র শিবিরের সাথী।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মেরাজ দেশ রূপান্তরকে জানান, আমি আগে যা করেছি তখন বয়স কম ছিল বন্ধুবান্ধবের সাথে গিয়েছি তখন অনেক কিছুই বুঝতাম না। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচারের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা আমাকে বলেছেন তুমি চিন্তা করো না, তুমি ভালো কাজ করছ তাই হিংসা করা হচ্ছে।
টাকা আত্মসাৎ বা বিভিন্নভাবে প্রবাসীদের কাছ থেকে টাকা আনার ব্যাপারে তিনি বলেন , এই রকম অভিযোগ করতে পারবে কিন্তু প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। এসব মিথ্যা।
ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়ার বিষয়ে বলেন, আমি ক্যাবের সদস্য । হয়ত সে পরিচয় দিয়েছি। খারাপ কোনো উদ্দেশ্যে কোনো পরিচয় দিইনি। আমার বিরুদ্ধে যা বলা হচ্ছে, সব অভিযোগ মিথ্যা, কেউ এর প্রমাণ দিতে পারবে না ।
মুজিববর্ষসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে মেরাজের সরব উপস্থিতি দেখা গেছে , কীভাবে সে প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল জানতে চাইলে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিন দেশ রূপান্তরকে জানান, আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান থাকে সেখানে অনেকেই আসে। আমরা কখনো তাকে দাওয়াত দিয়ে আনিনি। সে দাওয়াত ছাড়াই নিজ থেকে আসছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি থাকে চিনি না। অনেক সাধারণ মানুষ ছবি উঠে, সেখানে কে ভালো কে খারাপ তা আমাদের পক্ষে বুঝা কঠিন। এবং এই বিষয়ে আমাকে আগে কখনো কেউ অবগতও করেনি।