টিটেনাস বা ধনুষ্টংকার স্নায়ুতন্ত্রের এক ভয়ংকর রোগ, যা ক্লস্ট্রিডিয়াম টিটানি নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। রোগটি উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর দেশগুলোতে বেশি হয়ে থাকে এবং ব্যাকটেরিয়াটি উচ্চ জৈব যৌগের মাটিতে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। ৩৩ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জীবাণুটির বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। টিটেনাস নবজাতক থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সেই হতে পারে।
কারণ : মানবদেহে টিটেনাসের জীবাণু প্রবেশের প্রধান পথ চামড়ায় কাটাছেঁড়া স্থান বা মাংসপেশির ভেতরে গভীর ক্ষত। জীবাণুটি অক্সিজেনের উপস্থিতিতে বাঁচতে পারে না, তাই মাটিতে স্পোর সৃষ্টির মাধ্যমে বেঁচে থাকে। সড়ক দুর্ঘটনা বা যেকোনো নোংরা পরিবেশে দুর্ঘটনার ফলে ক্ষত সৃষ্টি হলে স্পোর পরিবেশ থেকে ক্ষতস্থানে ছড়িয়ে পড়ে। দূষিত ক্ষতকে তৎক্ষণাৎ পরিষ্কার না করলে সেখানে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয় এবং স্পোর থেকে মুক্ত হয়ে জীবাণু বংশবৃদ্ধি করতে থাকে। জীবাণুগুলো ক্ষতস্থানে টিটানোস্প্যাসমিন ও টিটানোলাইসিন নামক টক্সিন তৈরি করে। টক্সিনগুলো রক্ত ও লসিকার মাধ্যমে স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে এর বিভিন্ন অংশকে আক্রান্ত করে। পুরনো, মরিচা ধরা ও নোংরা কোনো লোহার টুকরো বা অস্ত্র, এমনকি একটি পেরেকের মাধ্যমে সৃষ্ট ক্ষত থেকেও স্পোর দেহে প্রবেশ করতে পারে। নবজাতককে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখলে বা নাভিরজ্জুতে কোনো নোংরা পদার্থ লাগালে সেখান থেকে স্পোর প্রবেশ করতে পারে।
লক্ষণ : ন্যূনতম দুদিন থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লক্ষণ শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে চোয়ালের মাংসপেশি সংকুচিত ও শক্ত হয়ে যায়, ফলে চোয়াল নাড়ানো যায় না। এ সময় জ্বর ও মাথা ব্যথাও হতে পারে। পরে মুখের মাংসপেশিও শক্ত হয়ে যায় এবং খাদ্যনালির সংকোচনের ফলে খাবার গলাধঃকরণে অসুবিধা হয়। ঘাড় ও পিঠের মাংসপেশিগুলোর তীব্র সংকোচনের ফলে পিঠ ধনুকের মতো বেঁকে যায়; অনেক সময় মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙেও যেতে পারে। তীব্রপর্যায়ে প্রচণ্ড খিঁচুনি শুরু হয় ও শ্বাসনালির সংকোচনের ফলে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। শব্দ, আলো বা সামান্য নাড়াচাড়ার প্রভাবেই খিঁচুনি শুরু হতে পারে।
প্রতিকার : টিটেনাস থেকে রক্ষা পেতে হলে কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় অথবা মরিচা ধরা লোহার মাধ্যমে ক্ষত সৃষ্টি হলেই, এমনকি সদ্য কাটাছেঁড়া স্থান কোনোভাবে দূষিত হয়ে গেলেও রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে। টিটেনাস টক্সয়েড টিকা ও টিটেনাস ইমিউনোগ্লোবিউলিন (টিআইজি) সরাসরি রোগীর মাংসপেশিতে ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। ক্ষতের আকার, গভীরতা ও দূষণের মাত্রা বিচার করে চিকিৎসক শিরাপথে অ্যান্টিবায়োটিকও দিতে পারেন। আগে টিকা নেওয়া রোগীর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বুস্টার ডোজ নিলেই চলবে।
শিশুর টিটেনাস রোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইপিআই শিডিউল অনুসারে বাংলাদেশে শিশুর ৬,১০ ও ১৪ সপ্তাহ বয়সে পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রসূতিকালীন ও নবজাতকের টিটেনাস প্রতিরোধে কিশোরীদের ১৫ বছর বয়স থেকে নির্দিষ্ট সময় পরপর আরও পাঁচ ডোজ টিটেনাসের টিকা দেওয়া হয়ে থাকে। সঠিক সময়ে এসব টিকা নেওয়া আবশ্যক।
চিকিৎসা : টিটেনাসে মৃত্যুর হার প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ এবং নবজাতকদের ক্ষেত্রে ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ। এজন্য লক্ষণ দেখামাত্র সময়ক্ষেপণ না করে চিকিৎসার জন্য রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। রোগীর সুস্থতা নির্ভর করে রোগের তীব্রতা ও রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ওপর।