চলচ্চিত্র, সংবাদপত্র, টেলিভিশনের পর্যায় পার হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিপুল প্রসারের এ সময়ে অনেকে মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে সচেতন করে তুলেছে। আসলেই কি তাই? প্রতিদিন খুব সহজেই অন্য মানুষের জীবনের নানা দিক দেখা এবং নিজেকে অন্যদের সামনে প্রকাশ করা সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে তৈরি হওয়া, এই দুই সুযোগ যা আগে কখনো ছিল না, তার আকর্ষণে বুঁদ থাকার কারণে নিবিড় জ্ঞানচর্চার প্রতি অনেক মানুষের আগ্রহ এখন কম। যখন অনেকের কাছে সোশ্যাল মিডিয়া মূলত বিনোদন পাওয়ার মাধ্যমে পরিণত হয়, তখন এই মাধ্যমে উপস্থাপিত সামাজিক সমালোচনার গাম্ভীর্য এবং গুরুত্বও কমে যায়।
পেশা যেহেতু অধ্যাপনা, তাই প্রতি বছর ঢাকার বিভিন্ন সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় শ্রেণিকক্ষে। দেখতে পাই দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের ফেইসবুক, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউব সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা থাকলেও দেশ-বিদেশের উঁচুমানের সাহিত্যিক কাজ, নিজ দেশের ইতিহাসের নানা দিক এবং বিভিন্ন ধ্রুপদি চলচ্চিত্র সম্পর্কে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর ধারণা অত্যন্ত কম। আমরা যখন স্কুল-কলেজে পড়তাম, সেই কেবল টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটবিহীন সময়ে আমরা পড়তাম বিভিন্ন বই। সেবা প্রকাশনীর ঝরঝরে বাংলা অনুবাদের পেপারব্যাক বইগুলো নিয়মিত প্রকাশিত হওয়ার কারণে ক্লাস নাইনে ওঠার আগেই পড়া হয়ে গিয়েছিল স্যার ওয়ালটার স্কট, আলেকজান্দার দ্যুমা, জুল ভার্ন, জ্যাক লন্ডন, রবার্ট লুইস স্টিভেনসন, এরিক মারিয়া রেমার্ক প্রমুখ বিখ্যাত লেখকের বিভিন্ন উপন্যাস। কিন্তু এখন যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষের ছেলেমেয়েদের আলেকজান্দার দ্যুমার থ্রি মাস্কেটিয়ারস, এরিখ মারিয়া রেমার্কের থ্রি কমরেডস বা রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের ট্রেজার আইল্যান্ড পড়েছে কি না, তা জিজ্ঞেস করি দেখি যে বেশির ভাগ ছেলেমেয়েই এই বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাসগুলো এখনো পড়েনি। অনেকে উপন্যাসগুলোর নামও শোনেনি। স্পষ্ট হয় যে, ইন্টারনেট-পূর্ববতী বাংলাদেশে কমবয়সীদের বই পড়ার চর্চা বেশি ছিল। আর এখন বহু টিভি চ্যানেল, ফেইসবুক, ইউটিউব চটকদার আর জৌলুশময় উপাদানের যে প্রলোভন তুলে ধরছে, সেই আকর্ষণে আচ্ছন্ন থেকে কমবয়সীদের বই পড়ার আগ্রহ ও ধৈর্য থাকছে না।
জ্ঞানার্জনের প্রতি আগ্রহ অনুভব না করে ফেইসবুক আর ইন্সটাগ্রামে ছবি আর বিনোদন-সর্বস্ব ভিডিও আপলোড করা, অন্যদের ছবি আর ভিডিওতে মন্তব্য করা, নানা ধরনের স্ট্যাটাস লেখা, চ্যাট করা এ ধরনের কাজে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাটানোর অভ্যাস কি মানুষের চিন্তার গভীরতা আর সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে সাহায্য করবে? অবশ্যই বিনোদন আমাদের জীবনের অপরিহার্য একটি দিক। কিন্তু কমবয়সী বহু ছেলেমেয়ে যদি টিকটক অ্যাপের সাহায্যে চটুল বিনোদন-সর্বস্ব এবং কখনো খুবই অরুচিশীল ভিডিও নিয়মিত তৈরি করে ফেইসবুকে আপলোড করতেই আনন্দ পায় এবং তারা যদি পড়ার বই ছাড়া একটি ভালো বইও কখনো ছুঁয়ে না দেখে, তাহলে তাদের বুদ্ধি ও রুচি অবশ্যই উঁচুমানের হবে না। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় ইতিহাস ও সভ্যতার প্রাক্তন অধ্যাপক এবং দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিকসের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অধ্যাপক তপন রায়চৌধুরীর পরিবার দেশভাগের পর বরিশাল ছেড়ে কলকাতা চলে গিয়েছিল। সেই দিনগুলোর কথা বর্ণনা করে তপন রায়চৌধুরী লিখেছেন, ‘সকাল ৮টা-সাড়ে ৮টায় বাড়ি থেকে বের হয়ে রাত ৮টা নাগাদ বাড়ি ফিরতাম। রাতে খাওয়ার পর পরদিন যা পড়াতে হবে তা কিছুটা ঝালিয়ে নিতাম। তবে এই রুটিনের ভেতরে গবেষণার কোনো স্থান ছিল না। কিন্তু বইপত্র তখনো সস্তা। ওই আয়ের থেকেই পয়সা বাঁচিয়ে কিছু কিছু বই কিনতাম। বার্ট্রান্ড রাসেল এবং অলডাস হাক্সলির লেখার সঙ্গে এ সময়েই ঘনিষ্ঠ পরিচয় হলো। আর কী একটা প্রাইজের টাকায় এভরিম্যানের প্রকাশিত অনুবাদে গ্রিক ক্ল্যাসিকসের প্রধান প্রধান বই কিনে ফেললাম। মূল্য একুনে চল্লিশ টাকা। দোতলায় বারান্দায় এক দিকটা পার্টিশন করে ছোট একটি ঘর বানানো হয়েছিল। সেইটা আমার পড়ার ঘর হলো। ওখানে বসে অনেক রাত অবধি পড়তাম। কোনো ক্লান্তি বোধ হতো না তখন।’
একদিকে নিজ দেশ ছেড়ে আসার কষ্ট, উদ্বাস্তু হয়ে অসচ্ছল জীবন কাটানোর উদ্বেগ আর অন্যদিকে দিনে প্রায় বারো ঘণ্টা পরিশ্রমের পরও অনেক রাত অবধি বই পড়তে তপন রায়চৌধুরী ক্লান্তি বোধ করতেন না, কারণ জ্ঞানার্জনের প্রতি তার গভীর আকর্ষণ ছিল। শুনতে পাই কমবয়সীরা এখন অনেক রাত অবধি জেগে থেকে ফেইসবুক ব্যবহার করে। কিন্তু রাত জেগে পরীক্ষায় পাসের জন্য না, জ্ঞানতৃষ্ণা মেটানোর জন্য বই পড়ছে কজন? কমবয়সীদের মধ্যে জ্ঞানার্জনের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করার প্রয়োজনীয় চেষ্টা না করে বিনোদন উপভোগের জন্য তাদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দিলে তাদের আসক্তি এবং নির্ভরতা তৈরি হবে হালকা বিনোদনের প্রতি। ইদানীং টেলিভিশন নাটকে প্রায়ই দেখা যায় কমবয়সীরা রেস্টুরেন্টে বসে সময় কাটাচ্ছে, মোবাইল ফোনে নিয়মিত কথা বলছে। আর তারা কথা বলছে কেবল নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে। দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই। কেউ ভালো বই পড়ছে এমন কোনো দৃশ্য নেই। গণমাধ্যমে প্রচারিত এই ধরনের নাটক তাই দর্শকদের চিন্তাশীল এবং সমাজসচেতন হতে উৎসাহিত করছে না। নাটকে, ওয়েব সিরিজে অশ্লীল দৃশ্য ব্যবহারের নিন্দা করা যেমন দরকার, তেমনি অশ্লীল দৃশ্যবিহীন যে টিভি নাটকের বিষয়বস্তু দর্শকদের অগভীর চিন্তায় অভ্যস্ত করে তোলে, সে ধরনের নাটক তৈরির সমালোচনাও করা জরুরি। অথচ এ ধরনের নাটকের প্রশংসা আর প্রচারই করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শুধু টেলিভিশন নয়, ফেইসবুক-ইউটিউবের মাধ্যমেও অগণিত দর্শকের কাছে এখন পৌঁছে যাচ্ছে এ ধরনের নাটক।
সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিতে যখন চিন্তাশীলতা আর রাজনীতি এবং ইতিহাস সচেতনতার চর্চা কমছে আর বাড়ছে হালকা বিনোদনে মশগুল থাকার প্রবণতা, তখন বহু মানুষের মধ্যে শক্তিশালীভাবে সামাজিক অন্যায়ের সমালোচনা করার সক্ষমতা তৈরি হবে, তা আশা করা যায় না। ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া, বিভিন্ন প্রতিবাদী ছবি আপলোড করলেই কি কার্যকর সামাজিক সমালোচনা হয়ে গেল? বুঝতে হবে, হাজার হাজার মানুষ হালকা বিনোদন উপভোগের জন্য ফেইসবুক ব্যবহার করছে এবং সামাজিক সমস্যার প্রকৃত কারণ বোঝার আগ্রহ এবং সক্ষমতাই তাদের নেই। কাজেই অল্প কিছু মানুষ যতই সামাজিক অন্যায়ের সমালোচনা করুক না কেন, সস্তা বিনোদনের ‘আফিম’-এ মজে থাকা বহু মানুষ তার মর্ম বুঝবে না। দেশের অধিকাংশ মানুষকে চিন্তাসমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উপাদান গ্রহণে আগ্রহী এবং অভ্যস্ত করে তাদের চিন্তায় গভীরতা না আনা পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট, স্ট্যাটাস আর ছবির মাধ্যমে সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা যাবে না।
আর্জেন্টিনার দুই চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক ফার্নান্দো সোলানাস আর অক্টাভিও গেটিনো ১৯৬৯ সালে তাদের সুবিখ্যাত চলচ্চিত্র ম্যানিফেস্টো টুয়ার্ডস আ থার্ড সিনেমায় বলেছিলেন, উগ্রতা, প্রথাবিরোধিতা, বিপ্লবী আচরণ, অসন্তোষ সবই পুঁজিবাদী বাজারের সামগ্রী হয়ে উঠতে পারে। হয়ে উঠতে পারে ভোগ্যপণ্য। মৃণাল সেনের কলকাতা ৭১ ছবিতে যেমন দেখা যায় দুর্ভিক্ষের সময় কালোবাজারি করে ধনী হওয়া এক শিল্পপতি দুর্ভিক্ষে না-খেতে-পাওয়া মানুষের ছবি তার খাবার ঘরের দেয়ালে টাঙ্গিয়ে রেখেছে। এমন একটি ছবি তার মতো মানুষের কাছে শুধুই পণ্য। এভাবেই বিভিন্ন প্রতিবাদও ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর কাছে উপভোগ্য উপকরণ হয়ে ওঠে, কারণ বহু মানুষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা-সৃষ্ট চটক আর চাকচিক্যের সংস্কৃতিতে মজে থাকায় অল্প কয়েকজনের প্রতিবাদ বহু মানুষের মনে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে না। অনেক মানুষের মনে চিন্তার গভীরতা তৈরি করা না হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থাপিত বিভিন্ন প্রতিবাদ হবে নিষ্ফল ও অসার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্থূলতা-সর্বস্ব চিন্তা প্রকাশের মাধ্যমও হয়ে উঠেছে। এখানে কখনো একজন অন্যকে খোলাখুলি গালি দিতেও দ্বিধা করছে না। করা হচ্ছে বিভিন্ন কুরুচিকর মন্তব্য। গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত মানুষও যখন ফেইসবুকে অশোভনভাবে লিখে মনের অনুভূতি প্রকাশ করেন, তখন বুঝতে হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন দায়িত্বহীন আচরণের সুযোগও তৈরি করছে, যা সংবাদপত্র বা টেলিভিশনে করা সম্ভব না। ব্যক্তিগত পরিসর আর জনপরিসরের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা মানুষের থাকতে হবে। নিজের একান্ত পরিসরে মানুষ বিভিন্নভাবে কথা বলতে পারে, অনেক ধরনের আচরণই করতে পারে। কিন্তু জনপরিসরে যেমন ইচ্ছা তেমনভাবেই কথা বলা যায় না, সব কাজ করা যায় না। এই সহজ ব্যাপারটি বোঝার বোধ মানুষের না থাকা হতাশাজনক। এই শতকের শুরু থেকেই বিভিন্ন টেলিভিশন নাটকে প্রায় চরিত্রদেরই অহরহ ঘরোয়াভাবে এবং কখনো খুব বিদঘুটে শব্দ ব্যবহার করে কথা বলতে দেখা গিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রচারিত নাটকে, বিজ্ঞাপনে ভাষার এমন ব্যবহার সাংস্কৃতিক মানের যে অধঃপতন ঘটিয়েছে, তার ফলে আমাদের সমাজে অনেকের চিন্তাভাবনা এবং কথা বলার ধরনেরও অবনতি হয়েছে, আমরা তাই দেখছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকের বক্তব্য এবং আচরণ তাদের চিন্তা আর রুচির সেই দুরবস্থারই নির্দেশ করছে।
প্রখ্যাত মার্কিন লেখক হেনরি ডেভিড থোরো বলেছিলেন, সেই সরকারই সর্বোৎকৃষ্ট, যারা প্রতাপ দেখাতে চায় না। থোরো মনে করতেন সরকারের জন্য সঠিক কাজ হলো নাগরিকদের রুদ্ধ না করে তাদের মন বিকশিত করা। থোরোর এই মত যৌক্তিক। কোনো বিধিনিষেধ দিয়ে মানুষের চিন্তার গভীরতা এবং দেশের সাংস্কৃতিক মান বৃদ্ধি করা কখনোই সম্ভব নয়। মানুষের মনে সুরুচি, সুবিবেচনা আর চিন্তাশীলতা সৃষ্টি করতে পারে এমন পরিবেশ তৈরি করা হলেই নাগরিকরা দীপ্যমান এবং দায়িত্বশীল হয়ে উঠবেন। এমন আলোকিত পরিবেশে নাগরিকদের মন বিকশিত হলে বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যম হীরক রাজের মগজ ধোলাই যন্ত্র হয়ে উঠতে পারবে না আর সেই সঙ্গে নাগরিকরা চিন্তার গভীরতা আর দীনতার পার্থক্য বুঝবেন।
লেখক
অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
naadir.junaid@gmail.com