ডিজিটাল আইনে সম্প্রতি কয়েকজনকে জেলে ভরা হয়েছে। ফেইসবুকে দু’চার কথা লিখে কারাবন্দির ঘটনায় নেটিজেনরা ত্যক্ত-বিরক্ত। ধরপাকড়ের বিপক্ষে নেটিজেন ও সিটিজেনরা অনলাইনে, অফলাইনে প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন। এসব চলাকালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে ফেইসবুকে চোখে পড়ল একটা সার্কাজম। ফেইসবুকে অবশ্য দুনিয়ার তাবৎ বিষয়েই সার্কাজম চলে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিপ্রতীপ বাস্তবতা বোঝাতে সার্কাজমটিতে ব্যবহৃত হয়েছে হাম্বুরাবির ছবি। খ্রিস্টের জন্মের পৌনে দ্ইু হাজার বছর আগের ব্যাবিলনীয় এই রাজা তার আইন-কানুনের জন্য বিশেষভাবে খ্যাত বা কুখ্যাত। হাম্বুরাবিকে দিয়ে বানানো সার্কাজমের লেখাটা ছিল অনেকটা এরকম : আপনার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে। কিন্তু মতপ্রকাশের পর স্বাধীনতা থাকবে কি না বলা যাচ্ছে না।
হাম্বুরাবির এই সার্কাজমের সঙ্গে ময়মনসিংহের ভাষার একটা রসের গপের খুব মিল। গপটা ডাকাতদের নিয়ে। রাম দা হাতে ডাকাত সর্দার। বাসযাত্রীদের ঝামেলা না করে চুপচাপ মূল্যবান মাল-সামান, টাকা-পয়সা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু সবাই যে নির্দেশনা শুনবে, তেমন নিশ্চয়তা নেই। তাই, সর্দার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘লড়ছুইন তে মরছুইন’।
হিসাব বরাবর। নড়ার স্বাধীনতা আপনার আছে। কিন্তু নড়লে পরে আপনার ‘ব্যান্ড বেজে যাবে’। ব্যান্ড বেজে যাওয়ার ভয়টা জারি থাকলে ‘লাড়া-চাড়া’ লোপ পায়। কারণ প্রতিরক্ষাহীন ভয়ার্ত মানুষ চিন্তার সামর্থ্য হারায়। মানুষ প্রথমে চিন্তা করে। পরে চিন্তা কাজে রূপ নেয়। কিন্তু সরব হয়ে কোপ খাওয়ার চেয়ে নীরব থেকে জান বাঁচানোটাই ফরজ। ভয়ের অনেক শক্তি। ভয় চিন্তার টুঁটি চেপে ধরে। একজনের বন্দিদশা আরেকজনকে মুখ খুলতে নিরুৎসাহিত করে। শঙ্কিত মানুষের মরমে ঋত্বিক ঘটকের তাগিদ পৌঁছানো কঠিন। দেশভাগের শিকার এই চলচ্চিত্রকার মানুষকে মগজ খাটানোর তাগিদ দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভাবো, ভাবো। ভাবা প্র্যাকটিস করো’। কিন্তু ভীতি থাকলে ভাবনা-চর্চা সহজ কম্ম নয়!
ভাবনা : অস্তিত্বের ইশতেহার
ফরাসি দার্শনিক, গণিতজ্ঞ ও বিজ্ঞানী রেনে দেকার্ত বলেছিলেন ‘আই থিঙ্ক, দেয়ার ফর আই অ্যাম’। বাণীর মর্মার্থ দাঁড়ায়, ‘আমি ভাবি, এটাই আমার অস্তিত্বের প্রমাণ’। অর্থাৎ চিন্তাই মানুষের অস্তিত্বের ইশতেহার। চিন্তা করার এবং চিন্তাকে জনসম্মুখে প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের অধিকার। চিন্তার স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেওয়াই রাষ্ট্রের কাজ। ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশান অফ হিউমেন রাইটস-এর ১৯ নম্বর ধারায় ব্যক্তির চিন্তার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ নম্বর ধারাও নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকারকে স্বীকার করে। কিন্তু লক্ষণীয় যে, জনপরিসরে বিড়াল-পায়ে ঢুকেছে ভয়। ভয়ের সংস্কৃতি বাড়লে চিন্তার স্বাধীনতা কমে।
এদেশের বিতাড়িত লেখকদের কথা ভাবুন, খুন হওয়া ব্লগারদের কথা ভাবুন, হত্যার শিকার সমকামী অধিকারকর্মীদের কথা ভাবুন, আক্রান্ত লেখক-প্রকাশকদের কথা ভাবুন, আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে বিদেশে আশ্রয় নেওয়াদের কথা ভাবুন, নিষিদ্ধ বইয়ের লেখক-প্রকাশকদের কথা ভাবুন। গত কয়েক দশকে চিন্তার স্বাধীনতা হরণের ঘটনাগুলো ভেবে-ভেবে ‘হৃদয় খুঁড়ে বেদনা’ জাগিয়ে তুলুন। হয়তো এই বেদনাই দেখাবে ৭১-এ স্বাধীন হয়েও বান্ধা দেওয়া মগজের স্বাধীনতার পথ।
দাউদ, তসলিমা, হুমায়ুন আজাদ...
কী অপরাধ ছিল ৭০-এর দশকের তরুণ কবি দাউদ হায়দারের? ১৯৭৪-এ প্রকাশ হয় দীর্ঘ কবিতা ‘কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নায় কালো বন্যায়’। তখনই দেশছাড়া। প্রথম আশ্রয় ভারতে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ঘটে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। নতুন শাসক জিয়াউর রহমান নির্বাসিত কবির প্রতি আরও কঠোর হলেন। অবশেষে কবির আশ্রিত জীবনের নৌকা জার্মানিতে ঠেকেছে। দাউদ দেশহারা আজ সাড়ে চার দশক! খুনের দায়ে যাবজ্জীবন সাজাও তো মোটে কুড়ি বছর! আর একটি কবিতার শাস্তি একজীবন!
কী অপরাধ ছিল তসলিমা নাসরিনের? কী ছিল তার নিষিদ্ধ হওয়া পুস্তক ‘লজ্জা’য়? লেখার দায় এভাবে চুকাতে হবে জীবনভর! হুমায়ুন আজাদের লেখার সঙ্গে, বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকতে পারে। মতের বিপরীতে আরও জোরালো যুক্তি দিয়ে ভিন্নমত প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। কিন্তু লেখার জবাবে যে দেশে লেখক কোপ খান, খুন হয়ে ঝরা শিমুলের মতন পড়ে থাকেন পথে সেদেশে চিন্তার স্বাধীনতা কই? কী চিন্তা করা যাবে আর কী চিন্তা করা যাবে না, যেদেশে তা পরোক্ষে নির্ধারণ করে দেয় বিভিন্ন পক্ষ, সেদেশে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগিয়ে তোলাই নাগরিকের পবিত্র কর্তব্য।
যৌনতা, নীতিপুলিশ, সুশীলতার উগ্রপন্থা...
গত কিছু দিন ধরে সিটিজেন ও নেটিজেনদের আলোচ্য বিষয় ওয়েব সিরিজ। এক দল একেবারে দাঁতে জিভ কেটে বলছেন, সংসার উচ্ছন্নে গেল! সুশীলতার নিক্তিওয়ালারা বিবৃতি দিয়েছেন, নীতিমালার জন্য কেঁদে মরছেন। এগুলো সুশীলতার মোড়কে উগ্রপন্থা ছাড়া আর কী? চারদিকে নিক্তি। এক পক্ষের নিক্তিতে তসলিমা, দাউদ, হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎরা অশ্লীল, অশালীন। আরেক দলের নিক্তিতে অশালীন এই ওয়েব সিরিজ। অতএব আওয়াজ তোলো! বন্ধ করো! তবে কি উগ্রতা আমাদের শিরায় শিরায়?
বাজারে যখন কোনো ক্রেতা জুতো কিনতে যান তখন পায়ের মাপের এবং নিজের রুচির সঙ্গে যায় তেমন জুতোটাই কেনেন। সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শন ও বিনোদনও ওই জুতোর মতোই। যে যার রুচি মতন বেছে নেন। নিজের মাপের চেয়ে ছোট বা বড় জুতো বাজারে থাকতে পারবে না বা নিজের রুচির বাইরে বাজারে জুতোর আর কোনো রং-নকশা কোনো কোম্পানিই উৎপাদন করতে পারবে না জাতীয় আব্দার কোনো ক্রেতাই করেন না। তাহলে সাহিত্য, সংস্কৃতি, নাটক ও সিনেমার উৎপাদকদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর হেতু কী?
নীতি-পুলিশিকে প্রশ্রয় দেওয়া সমাজ গুদামে পরিণত হয়। দরজা-জানালা বন্ধ গুদাম ঘরের হাওয়া গুমোট। দম বন্ধ হয়ে আসে। এইখানে জর্জ ফ্লয়েডের মতন গলায় কেউ হাঁটুচাপা না দিলেও মানুষের মনে হয়, দম আটকে আসছে।
নই বাঁধা নই দাসের রাজার ত্রাসের দাসত্বে...
প্রথম আলো পত্রিকায় গত ২৬ জুন প্রকাশিত খবর জানাচ্ছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এখন পর্যন্ত গড়ে প্রতিদিন তিনটি করে মামলা হচ্ছে। প্রতিবেদনটি বলছে, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘কটূক্তিমূলক’ পোস্ট দেওয়া, পোস্ট শেয়ার করা, কার্টুন বা ব্যঙ্গাত্মক চিত্র আঁকা, ই-মেইলে যোগাযোগ করা এবং নিজেদের মধ্যে চ্যাট করার দায়ে শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও বয়সের মানুষ এ বছর গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তারদের মধ্যে কমপক্ষে ৩৮ জন সাংবাদিক।” এই আইনে হওয়া বেশ কিছু মামলা প্রথম আলো পর্যালোচনা করে জানাচ্ছে, ‘করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর মামলার আসামিদের বড় একটি অংশ ত্রাণ চুরি, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার অনিয়ম, দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছেন বা কার্টুন এঁকেছেন’।
সিরিয়াসলি! কার্টুন আঁকার দায়ে লাল-দালানে! মার্কিন দেশে খবর নিন। সে দেশে প্রেসিডেন্টকে নিয়ে নাগরিকরা সদা রঙ্গ-ব্যঙ্গ করছে। রঙ্গ-ব্যঙ্গের দায়েও যদি গারদে যেতে হয়, তাহলে হাম্বুরাবির ছবি দিয়ে বানানো সেই সার্কাজমের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক কী?
জনপরিসর সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। জার্মান দার্শনিক ইউরগেন হেবারমাস জনপরিসরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছেন। নাগরিকরা জনপরিসরে সরব হবেন। সরকার, আইন-নীতি নিয়ে আলাপ তুলবেন। এটাই স্বাভাবিকতা। রাষ্ট্রকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স-এ রাখতে সরব জনপরিসরের বিকল্প নেই। গণতন্ত্রে জনতার অংশগ্রহণে পাবলিক ওপিনিয়ন বা জনমত অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বাহাসের মধ্য দিয়ে নাগরিকরা সমাজে ও রাষ্ট্রে অবদান রাখেন। হেবারমাসের এই বক্তব্যই আছে রবীন্দ্রনাথের গানে : ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে/নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?’
কিন্তু মানুষকে যদি কথা বলতে দেওয়া না হয়, সিনেমার দুই লাইন গান লিখে ফেইসবুকে পোস্ট দিলে যদি ব্যক্তিকে জের টানতে হয়, দুর্নীতিবাজ বা গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তির ব্যর্থতাকে নিয়ে কার্টুন আঁকার জেরে যদি জেলে যেতে হয়, তবে তো পরিস্থিতি গুরুতর। এই পরিস্থিতিতেই কি বিরতিহীনভাবে হাততালি দিতে থাকে ভয়ার্ত মানুষেরা?
ইউভাল নোয়াহ হারারি এবং একটি স্তালিনীয় গপ্পো...
করোনাকালে পৃথিবী স্থবির। উন্নতবিশ্বে জনগণের মধ্যে আস্থা ও আশাবাদকে ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। সেই চেষ্টা থেকেই ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছে। থমকে থাকা দুনিয়ায় কলেজ গ্র্যাজুয়েটদের জন্যেও এখন কোনো উৎসব নেই। তাই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কিছু বলতে প্রখ্যাত ক’জন মানুষকে আমন্ত্রণ জানায় ওয়াল স্ট্রিট। সেখানে ইতিহাসবেত্তা ও লেখক ইউভাল নোয়াহ হারারিও বক্তৃতা করেন। বক্তৃতাটিতে রুশ লেখক ও দার্শনিক আলেকজান্দার সোলঝেনিৎসিনের বরাত দিয়ে সোভিয়েত শাসক জোসেফ স্তালিনের আমলের এক গল্প বলেছেন হারারি। একবার স্তালিন্স ডে উপলক্ষে কনফারেন্সের আয়োজন হলো এক পেপার ফ্যাক্টরিতে। সেখানে স্তালিনকে উদ্দেশ্য করে দর্শকরা করতালি দিচ্ছিলেন। করতালির লহরী উঠল। হাততালি দিতে-দিতে দর্শকদের হাতব্যথা হয়ে গেছে, মাথা ঝিম মেরেছে। তবু কেউ হাততালি থামাচ্ছেন না। এভাবে ৩ মিনিট, ৫ মিনিট, ১০ মিনিট চলে গেল। কিন্তু আগে হাততালি থামিয়ে কেউ স্তালিনের বিরাগভাজন হতে চান না বলে সবাই হাততালি চালিয়ে গেলেন। এই অবস্থায় সেই ফ্যাক্টরির ডিরেক্টর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগে নিজে হাততালি থামালেন এবং বসলেন। তখন অন্যরাও থামালেন। অনুষ্ঠান শেষে ওই রাতেই সেই পরিচালককে ধরে নিয়ে গেল সিক্রেট পুলিশ। তারপর ১০ বছরের সাজা দিয়ে তাকে পাঠানো হয় গুলাগে।
এর নাম ভয়। এর নাম চিন্তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া। ভয়ের সংস্কৃতিতে মানুষ নীরবতার কুডলীর ভেতর বন্দি হয়ে যায়। নীরবতা কতটা আত্মঘাতী ইতিহাস তার সাক্ষী হয়ে গেছে।
লেখক
কবি ও সহকারী অধ্যাপক
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
afroja.shoma@gmail.com