দেশে একের পর এক নৌদুর্ঘটনায় শত শত মানুষ মারা গেলেও বিচার কিংবা পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ কোনোটিই পান না হতাহতদের স্বজনরা। প্রতিটি ঘটনার পর মামলা, তদন্ত এবং দোষী চিহ্নিত করা হলেও বছরের পর বছর বিচার প্রক্রিয়া আটকে থাকে। এমনকি অপ্রতুল ক্ষতিপূরণ দিয়ে পার পেয়ে যান মালিকরা।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, যেকোনো অবহেলায় মৃত্যু গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এই অপরাধের বিচার না হলে দৃষ্টান্ত তৈরি হয় না, অপরাধও নিয়ন্ত্রণে আসে না। বিগত ২০ বছরে সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় অসংখ্য লঞ্চ কিংবা নৌদুর্ঘটনা এবং প্রাণহানি ঘটেছে। কিন্তু এজন্য দোষীদের বিচার, সাজা কিংবা ক্ষতিগ্রস্তরা পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন এমন নজির নেই। এসব দুর্ঘটনার যেসব মামলা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে, সেগুলোরও কোনো সুরাহা হয়নি। দুর্ঘটনা কমাতে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো যুগোপযোগী করার পক্ষে মত দেন তারা।
গত সোমবার মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা এমএল (মোটর লঞ্চ) ‘মর্নিং বার্ড’ নামের লঞ্চকে শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গায় ধাক্কা দেয় ‘ময়ূর-২’ নামের বড় লঞ্চ। এতে মর্নিং বার্ড ডুবে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক, মাস্টারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর কেরানীগঞ্জ থানায় গতকাল দণ্ডবিধির ৩০৪ (ক) ধারায় ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’সহ ২৮০, ৩৩৭ ও ৩৪ ধারায় মামলা হয়। ৩০৪ (ক) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অপরাধজনক নরহত্যা নয় এমন কোনো বেপরোয়া বা তাচ্ছিল্যপূর্ণ কাজের মাধ্যমে কারও মৃত্যু ঘটালে ৫ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। বেপরোয়া নৌযান সম্পর্কিত ২৮০ ধারায় ৬ মাসের কারাদণ্ড এবং ৩৩৭ ধারা অনুযায়ী বিপজ্জনক কাজের মাধ্যমে আঘাতের জন্য ৬ মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোমবারের লঞ্চডুবির ঘটনা স্পষ্টত ফৌজদারি অপরাধ। দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। যদিও অতীতে এ ধরনের মামলায় কারও শাস্তি হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আগে অনেক কমিটি গঠন ও তারা ভালো কিছু সুপারিশও করেছিল। কিন্তু কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। আসলে দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আইনগুলো পর্যাপ্ত নয়। আইন পরিবর্তন করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করার মতো লোকবল ও যৌক্তিক সাপোর্ট নেই। মামলাগুলো নিষ্পত্তির পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত আইনের দুর্বলতা দূর করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৩ সালের ৮ জুলাই চাঁদপুরের মেঘনা নদীর মোহনায় এমভি নাসরিন লঞ্চ ডুবে ১১০ জনের মৃত্যু হয়। নিখোঁজ ছিল অন্তত ১৯৯ জন। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ১২১টি পরিবারকে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত মামলাটি অধস্তন আদালতের পর হাইকোর্ট হয়ে এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন।
এ ঘটনায় একই বছর চাঁদপুরের জেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত ৪০০ জনের তালিকা করে। পরে নৌ দুর্যোগ ট্রাস্টি বোর্ড হতাহতদের পরিবারকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিলেও সেটি অপ্রতুল দাবি করে নিহত ১২১ জনের পক্ষে ২০০৪ সালে ঢাকার একটি আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলা করে ব্লাস্ট (বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট), যাতে ২৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়। ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সপ্তম যুগ্ম জেলা জজ আদালত এক রায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ১৭ কোটি ১১ লাখ টাকা রায়ের ৬০ দিনের মধ্যে পরিশোধে বিআইডব্লিউটিএ (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ) সংশ্লিষ্ট লঞ্চ মালিক সমিতিসহ মামলার বিবাদীদের নির্দেশ দেয়। এরপর এই মামলায় বিবাদীদের জেরা ও যুক্তিতর্কের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ তুলে পুনরায় শুনানির আবেদন করা হলে সেটি নামঞ্জুর হয়। নামঞ্জুরের ওই আদেশের বিরুদ্ধে ওই বছরের ২৪ অক্টোবর হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করা হয়। এরপর ২৫ অক্টোবর হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের নামঞ্জুরের ওই আদেশ কেন বাতিল ও রদ করা হবে না এ প্রশ্নে রুল জারি করে। শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল খারিজ করে ২০১৭ সালের ৫ জুন রায় দিলে নিম্ন আদালতের ওই আদেশ বহাল থাকে। হাইকোর্টের দেওয়া রায় স্থগিত চেয়ে বিআইডব্লিউটিএ গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করে। সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতে আবেদনটি তোলা হলে চেম্বার আদালত এ বিষয়ে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠায়।
ব্লাস্টের অ্যাডভোকেট আয়েশা আক্তার জানান, গত ৮ মার্চ মামলাটি কার্যতালিকার অনেক পেছনে থাকায় শুনানি হয়নি। পরে সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ ও করোনা পরিস্থিতিতে আটকে রয়েছে।