উত্তরবঙ্গের বাতিঘরখ্যাত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) প্রতিষ্ঠার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও নিজ ক্যাম্পাসে চাকরিবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ এ সময়ে বেরোবিতে ভর্তি হয়েছে ১২টি ব্যাচ, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছে ছয় থেকে সাতটি ব্যচ। পড়াশোনা শেষ করে এখানকার শিক্ষার্থীরা বিসিএসসহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ভালো করছেন। তাদের অনেকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন বেশ কয়েকজন। অথচ ১২ বছরে বেরোবিতে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন মাত্র একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী। কর্মকর্তা পদেও নিয়োগবঞ্চিত থাকছেন শিক্ষার্থীরা।
সদ্য প্রকাশিত ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষায় বেরোবির ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মুন্নি রানী শিক্ষা ক্যাডারে ওই বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যলয়ের বিভিন্ন বিভাগের আরো অন্তত ১৫ জন সাবেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন ক্যাডারে চাকরি পেয়েছেন। এসব শিক্ষার্থীকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি নিজ ক্যাম্পাসে তারা উপেক্ষিত থাকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।
জানা যায়, ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ২০১৩-২০১৪ সাল থেকেই বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশোনা শেষে চাকরি জীবনে প্রবেশ করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রশাসনই নিজ ক্যাম্পাসে চাকরির বিষয়ে তাদের বিবেচনা করেনি। ২০১৭ সালের জুন মাসে বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ যোগদানের পর ২০১৮ সালের শেষ দিকে বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সিরাজাম মুনিরাকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেন। বিষয়টি তখন বেশ প্রশংসিত হলেও এরপর কোনো বিভাগে এর পুনরাবৃত্তি ঘটেনি।
শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ, বেরোবি থেকে প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণ প্রদকপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা যেমন চাকরি পাননি তেমনি নিজ বিভাগের সেরা শিক্ষার্থীরাও উপেক্ষিত থেকেছেন।
এ বিষয়ে ৩৮তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে ইংরেজি বিভাগে প্রথম হওয়া মুন্নী রানী বলেন, শুরু থেকেই শিক্ষকতার স্বপ্ন দেখেছি। এ জন্য বিভাগে ভালো পড়াশোনা করে অনার্স এবং মাস্টার্সে প্রথম স্থান অধিকার করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্য একবার আবেদন করেছিলাম কিন্তু হয়নি।
তিনি বলেন, যদি কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পাই তবে সেখানে চলে যাব।
বিশ্ববিদ্যলয় সূত্রে জানা যায়, এখন অবধি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের বেশিরভাগই ঢাকা, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট। এর বাইরে জগন্নাথ, শাবিপ্রবি এমনকি নতুন কুমিল্লা ও মাওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও পাস করে এখানে নিয়োগ পেয়েছেন। শুধু ভাগ্য খোলেনি বেরোবি শিক্ষার্থীদের।
বেরোবির প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বর্তমানে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গণিত বিভাগের প্রভাষক শাহজাহান ইসলাম বলেন, আমাদের এমন অনেক শিক্ষার্থী আছেন যাদের দশ-পনেরটা রিসার্চ পেপার রয়েছে। অথচ এমন অনেককেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের কোনো গবেষণা নেই, এটা নিজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাবিউর রহমান প্রধান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ভালো ফলাফলধারী প্রত্যেক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে নিজ ক্যাম্পাসে শিক্ষক হওয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো সেই কালচার গড়ে ওঠেনি। শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে আমি প্রশাসনের কাছে দাবি করব, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক মূল্যায়ণ করে শিক্ষকসহ বিভিন্ন পদে যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী যেন তাদের নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা হয়।
উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, বিশ্ববিদ্যলয় ভৈাগলিকভাবে একটা অঞ্চলের হলেও এটা হবে বিশ্বমানের তাই নিজ বিশ্ববিদ্যলয়েই চাকরি করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আমাদের শিক্ষার্থীরা যত বেশি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে, তত আমাদের ব্র্যান্ডিং হবে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে আমাদের খুব বেশি ব্যচ বের হয়নি, ব্যাচ সংখ্যা যত বেশি বের হবে, তত প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের এখানে শিক্ষকতার সুযোগ বাড়বে।