জন রাইট ভালো গিটারিস্ট। আশির দশকে নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক ছিলেন। লড়াকু ব্যাটসম্যান হিসেবেও সুনাম ছিল। তবে ভারতীয় কোচের দায়িত্ব নিয়ে তিনি অন্যসব পরিচিতিকে ছাপিয়ে গেছেন। তাই জন রাইট এই প্রজন্মের কাছে সফল একজন কোচ। এই সফল পরিচিতির আড়ালে থাকা ব্যাটসম্যান রাইট কেমন ছিলেন? কোচ হিসেবে তার সফল্যের রেসিপি কী? জন রাইটের ৬৬তম জন্মদিনে এই দুটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যাক।
১৯৫৪ সালের ৫ জুলাই ক্যান্টাবুরিতে জন্ম। টেস্ট অভিষেক ২৪ বছর বয়সে, ১৯৭৮-এ। ওয়েলিংটনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ওপেনিংয়ে নেমে প্রায় ৬ ঘণ্টা উইকেটে ছিলেন। ২৪৪ বল খেলে করেছিলেন ৫৫ রান। ৪৭ টেস্ট পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পেয়েছিল নিউজিল্যান্ড। এরপর আরও ৮১ টেস্ট খেলেছেন রাইট। সেঞ্চুরি করেছেন ১২টি, যার ৯টিতে দল হারেনি। নার্ভাস নাইটিজে তিনবার (দুবার ৯৯, একবার ৯৮) আউট না হলে রাইটের সেঞ্চুরি হতো ১৫। ভারতের বিপক্ষে দুর্দান্ত খেলতেন। এই একটা দেশের বিপক্ষে তার গড় ৬১। টানা পাঁচ বছর ভারতের কোচিং করানোর সময়ও দারুণ সাফল্য পেয়েছিলেন রাইট। অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে তার জুটি দলে বিপ্লব এনেছিল। তবে দেশের কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর সেভাবে সফল হতে পারেননি।
টানা ১৫ বছর টেস্ট খেলেছেন রাইট। বাঁহাতি ওপেনার হিসেবে নতুন বলের বিপক্ষে সফলও হয়েছেন। দেশের হয়ে টেস্টে প্রথম চার হাজার রানের মাইলফলক ছোঁয়ার নজির গড়েছিলেন রাইট। আশির দশকে ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিউজিল্যান্ডের যত সাফল্য, তার সবগুলোতে রাইটের অবদান আছে।
টেস্টে ৩৭.৮২ গড়ে রান ৫৩৩৪। প্রায় দেড়শ ওয়ানডেতে গড় ২৬.৪৬। সেঞ্চুরি মাত্র একটি। ফিফটি ২৪টি। এই পরিসংখ্যান হয়তো রাইটকে এতটা খ্যাতি এনে দিতে পারত না, যদি তিনি কোচ হিসেবে সফল না হতেন। প্রথম শুরু করেছিলেন কাউন্টি কোচিং। শতাব্দীর শুরুতে ভারতের কোচ হন। দায়িত্ব নিয়েই বদলে ফেলেন বিদেশের মাটিতে সাফল্যহীন দলের ভাবমূর্তি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০০১ সালে ঐতিহাসিক ইডেন টেস্টে তিনি ভিভিএস লক্ষ্মণকে তিন নম্বরে ব্যাট করতে পাঠিয়েছিলেন। অনেকেই মনে করেন রাইটের সেই সিদ্ধান্তই ছিল টার্নিং পয়েন্ট। বিনয়ের অবতার রাইট পরে বলেছিলেন, ‘লক্ষ্মণ প্রথম ইনিংসে দারুণ ব্যাট করেছিল। ড্রেসিং রুমে তখনো ও প্যাড পরে বসা। আমি, সৌরভ আর লক্ষণ মিলে আলোচনায় বসলাম। লক্ষ্মণ নিজে খুব উৎসাহী ছিল। সেটা দেখে সাহস পেলাম। ক্যাপ্টেন হিসেবে সৌরভই ছিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার শেষ মালিক। তবে লক্ষ্মণকে তিনে পাঠানোর ব্যাপারটা আলোচনার মাধ্যমে সবাই মিলে ঠিক করা হয়। আসলে ফলোঅন করার পরে আমরা বুঝে গিয়েছিলাম অস্ট্রেলিয়াকে পাল্টা আক্রমণ করতে হবে। নাহলে সিরিজ থেকেই আমরা ছিটকে যাব।’
স্টিভ ওয়াহর সেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মুম্বাইয়ে প্রথম টেস্টে হেরে ইডেনে খেলতে নেমেছিল ভারত। ফলোঅন করে জেতার পর রাইট বলেছিলেন, ‘টেস্টটা ইতিহাস হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য সিরিজ জিতে নেওয়া। কলকাতা টেস্ট অতীত মনে করে নতুন টেস্টের জন্য প্রস্তুত হও। মানুষ তোমাদের ইডেন টেস্টের জন্য মনে রাখবে। কিন্তু কলকাতা টেস্টের কথা ভুলে খেলতে নামতে হবে। আগ্রাসী থাকতে হবে মাঠে।’
সিরিজে দুরন্ত সেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিলেন সৌরভরা। তা সম্ভব হয়েছিল রাইটের ম্যানেজিং দক্ষতার কারণেই। শুধু সেই জয়ই নয়, রাইটের কোচিংয়ে ১৪ বছর পর পাকিস্তানে টেস্ট সিরিজ জিতেছিল ভারত। এরপর ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেও টেস্ট জেতে ভারত। সে সময় দল নিয়ে সৌরভ যে আগ্রাসন দেখাতেন, রাইট ছিলেন তার নেপথ্যের নির্মাতা।
কোচ হিসেবে রাইটের প্রতিভা চেনার চোখ ছিল অসাধারণ। তিনিই জাসপ্রিত বুমরাহকে প্রথম অবিষ্কার করেন। ‘ওকে আমি প্রথম দেখি ভারতের একটা ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে। আহমেদাবাদে খেলা হচ্ছিল। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে নতুন প্রতিভা খুঁজতে গিয়েছিলাম। দেখলাম, একটা ছেলে অস্বাভাবিক বোলিং অ্যাকশনে দারুণ ইয়র্কার করছে। বেশ দ্রুতগতিতে বল করছে। অনেকগুলো ইয়র্কার করল। বিশেষ করে একটা বলের কথা এখনো আমার মনে আছে। পিচে তৈরি ক্ষতের ওপরে পড়ে বলটা পার্থিব প্যাটেলের মাথার ওপর দিয়ে বাই চার হয়ে গেল। আমরা এর-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে বললাম ‘ওয়াও, দ্যাট লুকস ভেরি ভেরি ইন্টারেস্টিং’! ম্যাচ শেষে পার্থিবকে জিজ্ঞেস করলাম ছেলেটা কে? পার্থিব জানাল, ওর নাম জাসপ্রিত বুমরাহ। বয়স ১৮ বা ১৯ হবে। দারুণ প্রতিভাবান। এরপর মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেদিনই সই করানো হলো জাসপ্রিতকে।’ ২০১৩ সালের ওই ঘটনার সময় মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের কোচ ছিলেন জন রাইট।