ব্রহ্মপুত্র নদের অব্যাহত ভাঙনে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার সিদলা ইউনিয়নের সাহেবের চরের প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে চলে গেছে। গৃহহারা হয়েছে ৪০টিরও অধিক পরিবার। মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে এসব গৃহহারা পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও গ্রাম রক্ষা বাঁধ প্রকল্পের ঠিকাদারের গাফিলতি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় আজ গ্রামটির সহস্রাধিক পরিবার এখন ভাঙনের হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জেলার হোসেনপুর উপজেলার সিদলা ইউনিয়নের উপজেলার নিকটতম গ্রাম সাহেবের চর। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে উজান থেকে আসা খরস্রোতা ঢেউে ব্যাপকভাবে ভাঙন শুরু হয়।
এ অব্যাহত ভাঙনে প্রতিবছরই শতাধিক পরিবার গৃহহারা হয়। এবারও ইতিমধ্যে ৪০টিরও অধিক পরিবার তাদের ঘর-বাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
এভাবে ভাঙন চললে মানচিত্র থেকে গ্রামটি মুছে যাবে। গ্রামের গৃহহারা পরিবারগুলো অভাবী হওয়ায় তারা খাদ্য সংকটে ভুগছেন এবং শিশুরা অপুষ্টির শিকার হচ্ছে।
গৃহহারা মানুষ অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে। গৃহহারা পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বর্তমানে হুমকির মধ্যে রয়েছে সাহেবের চরের শেষ আশ্রয়স্থল বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রটি।
জানা গেছে, সাহেবের চর গ্রাম পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর বাম তীরে সরকারিভাবে একটি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প দেয়া হয়েছে। যা গত ২২ নভেম্বর ২০১৯ থেকে কাজ শুরু হলেও ২৫ জুন ২০২০ সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও নদীতীরে দৃশ্যমান কোনো কাজ এখনো পর্যন্ত হয়নি।
বর্তমানে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে জুন ২০২১ পর্যন্ত করা হয়েছে।
সাহেবের চর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা জানান, গ্রাম রক্ষা বাঁধ প্রকল্পটি এ মাসেই সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও নদীতীরে কানো কাজ এখনো পর্যন্ত হয়নি।
ঠিকাদারের গাফিলতি আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় আজ গ্রামটির এমন দশা হয়েছে।
এছাড়াও হোসেনপুর-গফরগাঁও সড়কে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর খুরশিদ মহল সেতু এলাকার জনস্বার্থে নির্মিত হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সেতুর ২ কিলোমিটার এলাকার মধ্য থেকে বালু উত্তোলন করা সম্পূর্ণ নিষেধ থাকা সত্ত্বেও এলাকার কতিপয় প্রভাবশালী চক্র নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজের যোগসাজশে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে বালু উত্তোলন করে লুটপাটের মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে গ্রামটি আজ হুমকির মুখে পড়েছে।
এদিকে স্থানীয় প্রশাসন অজ্ঞাত কারণে দেখেও না দেখার ভান করছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়ার জন্য এলাকাবাসী জোর দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় লোকজন বলেন, গ্রামের লোকজনের কাছে ব্রহ্মপুত্র এখন আতঙ্কের নাম। একসময় গ্রাম থেকে ২ কিলোমিটার দূরে থাকা নদটি ধীরে ধীরে গ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ভাঙনে এক সময়ের বিশাল গ্রাম সাহেবের চর এখন এক ছোট জনপদে পরিণত হয়েছে। গত ১৫ বছরে এখানকার বহু লোক পৈতৃকভিটা হারিয়ে গ্রামছাড়া হয়েছেন। যারা গ্রামে রয়েছেন ঝুঁকি ও আতঙ্ক তাদের নিত্যসঙ্গী। দুই সপ্তাহ ধরে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কিছুদিনের মধ্যে গ্রামটি দুই ভাগ হয়ে যেতে পারে।
ভাঙনকবলিত এলাকার আব্দুল কাইয়ূম জানান, তার ভিটে-বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবার কারণে পরিবার পরিজনকে নিয়ে খুবই কষ্টে আছে। সাহেবের চর এলাকার শত শত পরিবার অন্ন-বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে।
সরকারি-বেসরকারিভাবে কেউ আমাদের দেখছে না। আমাদের মাথা গুঁজার জায়গা নেই এখন।
হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ এস এম জাহিদুর রহমান এ ব্যাপারে বলেন, সাহেবের চর গ্রাম ও প্রকল্প পরিদর্শন করেছি। ভাঙন ও প্রকল্প কাজের অগ্রগতির বিষয়ে জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে অবহিত করেছি।
সাহেবের চর প্রাম পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর বাম তীরে বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওভারসিস মার্কেটিং প্রাইভেট লিমিটেড ঢাকাকে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প কাজের দৃশ্যমান না হওয়ার বিষয়টি মুঠোফোনে জানতে চাইলে সদুত্তর দিতে পারেননি।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানান, প্রকল্পটির মধ্যে আপদকালীন সময়ের জন্য আগামীকাল ৫ জুলাই ২০২০ থেকে কাজ দ্রুত শুরু করা হবে।