সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরতদের বেশিরভাগই দাসত্বের জীবনযাপন করেন। কিন্তু করোনাভাইরাস ওই অঞ্চলের গৃহকর্মীদের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে লিঙ্গ, স্পন্সরশিপ ব্যবস্থা ও বিচ্ছিন্নতা নারী গৃহকর্মীদের জন্য বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে সৌদি আরবের কয়েকজন গৃহকর্মীর কেসস্টাডি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, অনেক আরব দেশে পরিবারগুলো গাড়ি চালানো, ঘরদোর পরিষ্কার রাখা এবং শিশু ও প্রবীণ স্বজনদের যতœ নেওয়ার জন্য এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আসা লাখ লাখ প্রবাসী কর্মীর ওপর নির্ভর করে। কিন্তু তাদের স্বল্প বেতন দিয়ে দাসদের মতো পরিস্থিতিতে রাখা হয়।
সৌদিতে এমন পরিস্থিতিতে থাকা কেনিয়া থেকে আসা আপিসাকি নামের এক নারীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় নিউ ইয়র্ক টাইমসের। ওই নারী বলেন, আমরা সবাই আতঙ্কিত। এখানকার পরিবেশ মোটেই ভালো না। কেউ আমাদের আওয়াজ শুনতে পায় না।
তিনি জানান, লকডাউনের কারণে তার মতো মোট ৯ জন চাকরি হারিয়েছেন। দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কয়েকটা পাতলা মাদুর দিয়ে তাদের একটি খালি ঘরে ঢুকিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখে। সেখানে কেউ কেউ মার্চ থেকে আছেন। একজন এখন ছয় মাসের গর্ভবতী হলেও কোনো যতœ পাচ্ছেন না। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজনকে দেয়ালের সঙ্গে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। তাদের দিনে একবার খাবার দেওয়া হয়। সেখান থেকে কখন বের হতে পারবেন সেটাই জানেন না।
শ্রমিক অধিকারকর্মীরা বলছেন, এখন মহামারী ও তার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা তাদের বিপদকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে। ভাইরাস বয়ে নিয়ে আসবে ভয়ে অনেক পরিবার গৃহকর্মীদের ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। লকডাউনের কারণে পুরো পরিবার ঘরে থাকায় গৃহকর্মীদের কাজও অনেক বেড়ে গেছে।
অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বেতন দিতে না পেরে লেবাননের বৈরুতে নিয়োগকর্তারা অনেক ইথিওপীয় নারীকে ফেরত পাঠাতে তাদের দেশের কনস্যুলেটের সামনে জড়ো করেছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাবে, লেবানন ও জর্ডানসহ অন্যান্য আরব অঞ্চলে যে পরিমাণ বিদেশি গৃহকর্মী ও আয়া কাজ করেন, তা বিশ্বের অন্য কোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি। আবুধাবি ডায়ালগ নামের একটি সংস্থার এক গবেষণায় দেখা যায়, শুধু এই দেশগুলোতে ২০১৬ সালে প্রায় ৪০ লাখ অভিবাসী গৃহকর্মী ছিল, যাদের অর্ধেকেরও বেশি নারী। তবে এই সংখ্যা এখন অনেক বেড়েছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এদের বেশিরভাগ নিয়োগ দালালদের মাধ্যমে এবং বাধ্যতামূলক আবাসিকতাসহ স্পনসরশিপ ব্যবস্থার আওতায় হয় বলে তাদের ওপর নিয়োগকর্তার ব্যাপক ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আবাসিকতা না হারিয়ে তারা চাকরি ছাড়তে পারে না বা নতুন চাকরিতে চলে যেতে পারে না বা নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া দেশও ছাড়তে পারে না।
মাইগ্রান্ট-রাইটস নামে একটি অধিকার গোষ্ঠীর সহযোগী সম্পাদক বানী সরস্বতী বলেন, কেউ আপনার প্রতিটি নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টাই তার বাড়িতে আছেন। তাহলে কল্পনা করুন, নিয়োগকর্তাদের কী পরিমাণ ক্ষমতা! তিনি বলেন, এমনকি চরম নির্যাতিত হয়েও সম্পূর্ণ গৃহহীন হওয়ার ভয়ে শ্রমিকরা তাদের নিয়োগকর্তাকে ছাড়তে দ্বিধাবোধ করেন।