‘উইন্ডিজের আধিপত্য খর্ব করতেই যত নিয়ম’

জোফরা আর্চারকে নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে খুব মাতামাতি। এই ফাস্ট বোলারের জন্ম ওয়েস্ট ইন্ডিজে। কিন্তু এখন খেলছেন তিনি ইংল্যান্ডের হয়ে। তার মতোই বার্বাডিয়ান রোল্যান্ড বুচার ছিলেন ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটার। ১৯৫৩তে জন্ম নেওয়া বুচারের অভিষেক জন্মভূমি উইন্ডিজের বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটা খুব সংক্ষিপ্ত। মাত্র তিনটি করে টেস্ট আর ওয়ানডে খেলতে পেরেছেন। আশির দশকে ক্লাইভ লয়েডের ভয়ংকর উইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম সিরিজে ব্যর্থ হওয়ার পর দল থেকে বাদ পড়েন। এরপর কাউন্টি খেলতে গিয়ে বলে চোখে আঘাত পান। ফলে আর খেলতে পারেননি। বিশ্বের একমাত্র টেস্ট ক্রিকেটার যার উয়েফা কোচিং লাইসেন্সও আছে।

ইংল্যান্ডের হয়ে খেললেও মাতৃভূমির টান উপেক্ষা করতে পারেননি বুচার। তাই ফিরে  গেছেন বার্বাডোজে। উইন্ডিজ ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইংল্যান্ডের হয়ে প্রথম টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বুচার বলেন, ‘গায়ের রঙের জন্য নয়, আমি ইংল্যান্ড জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছিলাম ক্রিকেটীয় দক্ষতার জন্য। সে সময় ভালো ছন্দে ব্যাট করছিলাম। মিডলসেক্সের হয়ে ১৯৮০ সালে বেশ কিছু বড় স্কোর করেছিলাম। তাই নজরে পড়ি নির্বাচকদের। এজবাস্টনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডেতে ডাক পাই। শুরুটা ভালোই হয়েছিল। হাফসেঞ্চুরি করেছিলাম। পরের বছর ইংল্যান্ডের উইন্ডিজ সফরে আমাকে স্কোয়াডে রাখা হয়েছিল। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। জেফ্রি বয়কট, ইয়ান বোথাম, গ্রাহাম গুচদের মতো তারকা ক্রিকেটারদের সঙ্গে খেলার সুযোগ শুধু গায়ের রং দেখিয়ে পাওয়া যায় না। আমাকে দেখে পরবর্তীকালে অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল।’

বার্বাডোজে যেদিন বুচারের অভিষেক হয় সেদিন স্থানীয় সংবাদপত্রে লেখা হয়েছিলÑ ‘আওয়ার বয়, দেয়ার ব্যাট।’ আগে থেকেই বার্বাডোজ এবং ইংল্যান্ডের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। বার্বাডোজকে বলা হতো ‘লিটল ইংল্যান্ড’। ১৯৬৬ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছিল দ্বীপটি। ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব ছিল। ১৯৮১’র বার্বাডোজ টেস্টের দ্বিতীয় দিনে ইংল্যান্ড ম্যানেজার, প্রখ্যাত ক্রিকেটার কেন ব্যারিংটনের হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়। এই মৃত্যু বুচারের অভিষেক টেস্ট খেলার আনন্দ মাটি করে দেয়। প্রথম ইনিংসে ১৭ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ২ রান করেছিলেন বুচার।

জন্মস্থান বার্বাডোজ ছেড়ে বুচারের মা-বাবা অনেক আগেই ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। ছোট্ট বুচার দাদির সঙ্গে বার্বাডোজেই থাকতেন। ১৩ বছর বয়সে তাকে ইংল্যান্ডে নেওয়া হয়। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে প্রথমে তার কষ্ট হয়েছিল। বুচার বলেছেন, ‘ইংল্যান্ডে দেখতাম আমার বয়সী অনেক ছেলে ফুটবল খেলছে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে আবার শুধুই ছিল ক্রিকেট। বার্বাডোজে থাকার সময়ই ক্রিকেটের প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মায়। স্বপ্ন দেখতাম উইন্ডিজের হয়ে এক দিন খেলব। কিন্তু ভাগ্য আমাকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। ইংল্যান্ডের হয়ে খেলতে পেরেছি বলে নিজেকে আমি ভাগ্যবান বলেই মনে করি।’

যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের নির্যাতন কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড মৃত্যুর পর বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের বড় সমর্থক রোল্যান্ড বুচার। সম্প্রতি বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন ক্যারিবীয় কিংবদন্তি মাইকেল হোল্ডিং। সাউদাম্পটন টেস্টের আগে বলা সেই কথাগুলো নাড়া দিয়ে গেছে বুচারকেও, ‘মাইকেল হোল্ডিং সঠিক সময়ে শক্তিশালী বক্তব্য রেখেছে। আমার মনে হয় অতীতের ক্রীড়াবিদদের আরও বেশি সরব হওয়া উচিত ছিল। আরও ব্যাপকভাবে প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল। এখন সারা বিশ্বে সংখ্যালঘুদের সমানাধিকারের দাবি উঠেছে, আন্দোলন হচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে শুধু ক্রিকেট নয়, এই সমস্যা সমাধানের জন্য সব ধরনের খেলা এবং সব সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে। সবারই কর্তব্য রয়েছে। সবাই এগিয়ে এলে তবেই হয়তো অন্য এক পৃথিবীর সন্ধান আমরা পাব।’

কিছুদিন আগে ড্যারেন স্যামি বলেছিলেন, ‘লিলি-টমসন বাউন্সার দিলে ক্ষতি নেই। কিন্তু একটা কৃষ্ণাঙ্গ দল যখনই পেস বোলিংয়ে দাপট দেখাতে শুরু করেছিল, তখনই বদলে গেল বাউন্সারের নিয়মকানুন।’ স্যামির মন্তব্যের সঙ্গে একমত বুচার বলেছেন, ‘বিশ্ব ক্রিকেটে উইন্ডিজের একাধিপত্য ঠেকাতেই প্রতি ব্যাটসম্যানকে ওভারপিছু একটি বাউন্সারের নিয়ম চালু করা হয়। অজুহাত দেখানো হয়, দর্শকদের পয়সা উশুল হচ্ছে না। কেননা দৈনিক পর্যাপ্ত পরিমাণ ওভার বোলিং করে উঠতে পারছেন না উইন্ডিজের পেসাররা। তাদের অপরাধী মনে করা হচ্ছিল। সেই কারণে প্রতি ঘণ্টায় ন্যূনতম ১৫ ওভারের নিয়ম চালু করা হয়। সে সময় উইন্ডিজের বিরুদ্ধে কোনো দলই সারা দিন ব্যাট করতে পারত না। বিশ্বজুড়ে লিলি বা টমসনরা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে যে ত্রাসের সঞ্চার করতেন তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ করা হয়নি। কেবলমাত্র উইন্ডিজকেই ফাঁদে ফেলা হয়।’

এই ফাঁদ কেটে বেরোতে চান বুচার। তাই যেকোনো ধরনের বৈষম্যের প্রতিবাদ করেন তিনি। মনেপ্রাণে হয়ে ওঠেন আরও বেশি ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান।