জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি-র মহিলা সদস্য বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হওয়া হুগলির বাসিন্দা প্রজ্ঞাকে নিয়ে ভারতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় নব্য জেএমবির (জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) নারী শাখার সদস্য আয়েশা জান্নাত মোহনা ওরফে জান্নাতুত তাসনিম ওরফে প্রজ্ঞা দেবনাথের (২৫) চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ঢাকা মহানগর হাকিম মাসুদুর রহমান এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শনিবার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত সূত্র এ নিশ্চিত করেছে। আদালতের সূত্র মতে, শুক্রবার তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। মতিঝিল থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। শুনানি শেষে বিচারক চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের একটি টিম। গ্রেফতারের সময় তার হেফাজত থেকে একটি ভারতীয় পাসপোর্ট, একটি বাংলাদেশের জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট, একটি বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
ভারতীয় গণমাধ্যম আনন্দবাজার জানায়, আয়েশা জান্নাত মোহনা আসলে হুগলির ধনিয়াখালির কেশবপুর গ্রামের প্রজ্ঞা দেবনাথ। পত্রিকায় তার গ্রেপ্তারের ছবি দেখে গ্রামের সকলে তাকে চিনতে পারে।
তার বাবা-মা জানায়, সে সংস্কৃত নিয়ে ধনিয়াখালি কলেজে পড়ত। ২০১৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর কলকাতা যাবে বলে বাড়ি থেকে বের হয় সে। তার পর থেকে বেপাত্তা। বেশ কয়েক দিন পরে ফোন আসে অচেনা নম্বর থেকে। মাকে মেয়ে জানায়, সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। বিয়েও করেছে সেই ধর্মের এক ছেলেকে। তারপর থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কিন্তু মেয়ে যে জঙ্গি দলে নাম লিখিয়েছে, তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি বাবা-মা-আত্মীয় স্বজন থেকে শুরু করে পাড়া প্রতিবেশীরাও।
প্রজ্ঞার মা গীতা বলেন, পড়াশোনায় খারাপ ছিল না মেয়ে। মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকে ভালই রেজাল্ট করেছিল। সংস্কৃত নিয়ে ভর্তি হয়েছিল ধনিয়াখালি কলেজে। তবে পড়া শেষ করার আগেই বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় প্রজ্ঞা।
বাবা প্রদীপ দেবনাথ দিনমজুরের কাজ করেন। মা গীতা বাড়িতেই সেলাই করে ফেরি করেন সস্তার জামাকাপড়। দিন আনা দিন খাওয়া অবস্থা। তার মধ্যেই ছেলে এবং মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন প্রদীপ-গীতা।
বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, প্রজ্ঞা নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ২০০৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। অনলাইনে জিহাদিরা প্রজ্ঞাকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করে বলে দাবি করেছেন গোয়েন্দারা।
গীতা বা প্রদীপের দাবি, সে সময়ে মেয়ের কোনও পরিবর্তন তাদের চোখে পড়েনি। তবে কলেজ যাওয়ার পর থেকে যে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে মেয়ে জড়িয়ে পড়েছিল তা তারা স্বীকার করেন। এলাকার বাসিন্দারাও বলেন, প্রজ্ঞা কলেজে পড়ার সময় থেকেই বাইরের লোকজন আসা যাওয়া শুরু করে ওদের বাড়িতে। তার পর আমরা প্রতিবাদ করলে বাইরের লোকের আসা যাওয়া বন্ধ হয়।
বাংলাদেশ পুলিশের দাবি, গত ফেব্রুয়ারি মাসে নব্য জেএমবি-র মহিলা শাখার প্রধান আসমানি খাতুন গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই সংগঠনের মহিলা শাখা চালাচ্ছিল প্রজ্ঞা। জঙ্গি সংগঠনে তার নাম ছিল আয়েশা জান্নাত মোহনা এবং জন্নাতুল তাসমিন। অনলাইনে নতুন সদস্য নিয়োগ করা থেকে শুরু করে ‘দাওয়াত’ বা নিয়োগের প্রক্রিয়া চালাতো প্রজ্ঞা। ওমানে পাকাপাকি ভাবে থেকে যাওয়া এক বাংলাদেশি নাগরিককে ফোনে ‘নিকাহ’ করে সে। তার স্বামীও নব্য জেএমবি সংগঠনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ। ভারত এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অনথিভুক্ত মাদ্রাসায় শিক্ষিকার কাজ করত প্রজ্ঞা। সেখান থেকেই চলত প্রশিক্ষণের কাজও। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগঠনের জন্য টাকা সংগ্রহ করা এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে সেই টাকা খরচ করা।
আনন্দবাজার জানায়, বাংলাদেশে প্রজ্ঞার গ্রেপ্তারের পর জঙ্গি সংগঠনে নিয়োগ রোধ ও নজরদারির দায়িত্বে থাকা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একটি মেয়ে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ চলে গেল এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল, সেই খবর গোয়েন্দাদের কাছে কেন পৌঁছাল না তা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রজ্ঞার ঘটনা প্রমাণ করছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তেই জমি তৈরি করছে এই ধরনের সংগঠন। বাড়ি থেকে পালিয়ে সেই সংগঠনে যোগ দিচ্ছে তরুণ-তরুণীরা। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তার দাবি, ভারতে প্রজ্ঞাই প্রথম কোনও মহিলা, যে ধর্ম পরিবর্তন করে জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিয়েছে। আর এই প্রবণতা যে যথেষ্ট চিন্তার তা স্বীকার করেন তিনি।