বিয়েলসা ক্যারিশমায় ফের প্রিমিয়ারে লিডস

ফুটবলের প্রায় সব কোচকেই ডাগআউটের চেয়ারে বা কোচদের জন্য নির্দিষ্ট লাইনের ভেতরে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে দেখা যায়। ব্যতিক্রম মার্সেলো বিয়েলসা। তিনি ডাগআউটের সামনে ফুটবলারদের জন্য আনা পানির পাত্রের বালতির ওপর বসে খেলা দেখেন, নির্দেশনা দেন। অন্য কোচদের মতো উঁচুমানের জীবনযাপন করেন না তিনি। ইংল্যান্ডে একটি দোকানের ওপর এক বেডরুমের একটি বাসাতেই তার হয়ে যায়। আবার অন্য কোচদের মতো ঝাঁ চকচকে অফিস রুম তার পছন্দ না। বাড়ির পাশের কোনো কফি শপে বসেই করে ফেলেন টিম মিটিং। এমন অনেক চমৎকার তথ্য জড়িয়ে আছে তার নামের সঙ্গে। আর তাই আর্জেন্টাইন এই কোচকে ডাকা হয় ‘এল লোকো’ মানে পাগল বলে। তো এই পাগলের হাত ধরেই ১৬ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়েছে লিডস ইউনাইটেড। এক সময়ের প্রিমিয়ার লিগ জায়ান্ট এতদিন প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল। তৃতীয় বিভাগ পর্যন্ত নেমে যাওয়া দলটি অবশেষে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ কোচ বিয়েলসার হাত ধরেই আবার উঠে এলো প্রিমিয়ারে। সামনের মৌসুমে আবার লিভারপুল, ম্যানইউদের সঙ্গে প্রিমিয়ারে টক্কর দেবে ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত তিনবারের ইংলিশ লিগ চ্যাম্পিয়নরা।

২৪ দলের দ্বিতীয় সারির লিগ ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপের ৪৪ রাউন্ড শেষে ৮৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে লিডস। ১৭তম স্থানে থাকা হাডার্সফিল্ড টাউনের কাছে তালিকায় দ্বিতীয় ওয়েস্টব্রুম ২-১ এ হেরে গেলে লিডসের প্রিমিয়ার লিগ উত্তরণ নিশ্চিত হয়। এই কাজটা করেছেন বিয়েলসা। কোচ হিসেবে লিডসকে আপন করে নিয়েছেন এই আর্জেন্টাইন। তাই ২০১৮ তে দায়িত্ব নিয়ে গত মৌসুমেই দলটিকে প্রায় প্রিমিয়ার লিগে তুলে এনেছিলেন। কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের ডার্বি কাউন্টির কাছে প্লে অফে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে হতাশ হতে হয় বিয়েলসার দলকে। কিন্তু চেষ্টার ধারাবাহিকতা রেখে পরের মৌসুমেই প্রিমিয়ার লিগ নিশ্চিত করে থামলেন বিয়েলসা।

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে খেলা হয়নি তার। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করার পরই ধরেন কোচিং। ১৯৯০ থেকে ক্যারিয়ারে মোট ১১টি দলের কোচ হলেও তার সাফল্য খুব কমই। সবচেয়ে বেশি সাত মৌসুম ছিলেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের দায়িত্বে (১৯৯৮-২০০৫)। পরে চিলি জাতীয় দলকে কোচিং করিয়েছেন। ক্লাবের মধ্যে আর্জেন্টিনার নিউওয়েলস ওল্ড বয়েসকে দিয়ে তার কোচিং ক্যারিয়ার শুরু। নিজের খেলোয়াড়ি জীবনও শুরু করেছিলেন এই ক্লাবে। এরপর মেক্সিকোর সেরা ক্লাব আমেরিকা, স্পেনে এস্পানিওল, অ্যাথলেটিক বিলবাও; ফ্রান্সে মার্শেই ও লিলেকে কোচিং করিয়ে ২০১৮ থেকে আছেন লিডসের সঙ্গে। এর মধ্যে ইতালির লাজিও দলের দায়িত্বও নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ক্লাবের পরিবেশ ভালো লাগেনি বলে মাত্র দুদিনের মাথায় চাকরি ছেড়ে দেন এল লোকো।

কোচিংয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ার হলেও সাফল্য খুব কমই পেয়েছেন বিয়েলসা। এমনকি তাকে যারা গুরু মানেন সেই বর্তমান যুগের কোচদেরও তার চেয়ে বেশি সাফল্য আছে। বিয়েলসাকে ‘মেন্টর’ মনে করেন পেপ গার্দিওলা। বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার আগে বিয়েলসার কাছে কোচিং টিপস নিয়েছিলেন এই স্প্যানিয়ার্ড। বিয়েলসাকে ‘জিনিয়াস’ মনে করা মরিসিও পচেত্তিনোর নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজে আসা তো তার হাত ধরেই। আবার ২০১৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদ কাস্তিয়ার কোচের দায়িত্ব পাওয়ার সময় বিয়েলসার টিপস নিয়েছিলেন জিনেদিন জিদানও। ওই সময় নিজের দেশ ফ্রান্সে উড়ে গিয়ে মার্শেইয়ের কোচ বিয়েলসার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করেন জিদান। তখন জিদানকে প্রশংসায় ভাসিয়ে বিয়েলসা ফরাসি কিংবদন্তিকে ফুটবলের মনুমেন্টের সঙ্গে তুলনা করেন।

বিয়েলসা সম্পর্কে গার্দিওলা বলেছিলেন, ‘তিনি আমার দেখা এমন একজন কোচ যিনি সবসময় সবকিছুর জন্য তৈরি থাকেন।’ বিয়েলসাকে বিশ্বের সেরা কোচ উল্লেখ করে সামনের মৌসুমে তার বিপরীতে দাঁড়ানোর সুযোগটা নিতে চান বলে জানান গার্দিওলা, ‘আমি তার সঙ্গে লড়তে ভালোবাসব। এটা আমার জন্য চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বা প্রিমিয়ার লিগের চেয়েও বড় লড়াই। ভালোবাসা আমার কাছে যে কোনো কিছুর চেয়ে বড়, বিয়েলসা আমার কাছ থেকে সেই বড় বিষয়টা পাবেন।’ সাবেক টটেনহ্যাম কোচ পচেত্তিনো বিয়েলসা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি সব সময় প্রশংসা করব এমন একজন হলেন বিয়েলসা। সে আমাদের সাধারণ কোচের মতো না। তার হাবভাব, চালচলন এমনকি চিন্তাধারাও সবকিছুই স্পেশাল। এরজন্যই তিনি স্পেশাল এবং বিশ্বের সবচেয়ে আলাদা একজন কোচ।’

গত মৌসুমে ডার্বি কাউন্টির অনুশীলনে চর পাঠিয়েছিলেন বিয়েলসা। তা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় লিডসকে ২ লাখ পাউন্ড জরিমানা করা হয়। সেই অর্থের পুরোটাই নিজের পকেট থেকে দেন বিয়েলসা। আবার গতবার প্লে অফের খেলায় অ্যাস্টন ভিলার সঙ্গে খেলায় দলটির একজন ফুটবলার আহত হয়ে মাঠে পড়ে থাকা অবস্থায় গোল দেয় লিডস। এ নিয়ে স্টেডিয়ামজুড়ে প্রতিবাদ হয়। বিয়েলসা তার দলকে নির্দেশ দেন অ্যাস্টন ভিলাকে একটি গোল উপহার দিতে। যার কারণে ফেয়ার প্লে পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।

‘এল লোকো’ নামের সঙ্গে তার মিল থাকার আরও ঘটনা আছে। চিলিকে ১২ বছর পর প্রথম বিশ্বকাপ মূল পর্বে খেলার সুযোগ করে দেন এই কোচ। ওই সময় এক সংবাদ সম্মেলনে তাকে ফুটবল বাদ দিয়ে তার বাঁধানো দাঁত সঙ্গে না আনার কারণ জানতে চান এক সাংবাদিক। এরপর থেকে সাংবাদিকদের তার দলের অনুশীলন দেখতে আসা বন্ধ করে দেন বিয়েলসা। দু’বছর পর মার্শেইয়ের কোচ থাকাকালীন তাকে এই ব্যাপারটি জিজ্ঞাস করা হলে প্রায় ১০ মিনিট ধরে সাংবাদিকদের তার দাঁত নিয়ে গল্প শোনান বিয়েলসা।