বাহান্নর সেই ভারতীয় দলটা খারাপ ছিল না। তবু ফ্রেড ট্রুম্যানের আগুন থেকে বাঁচতে পারেনি। দিনে দু’বার আউট হয়েছিল!
আজ থেকে ঠিক ৬৮ বছর আগের ঘটনা। ওল্ড ট্র্যাফোর্ড টেস্ট শুরু হয়েছিল ১৯৫২ সালের ১৭ জুলাই। আগে ব্যাট করেছিল ইংল্যান্ড। সেঞ্চুরি করেছিলেন অধিনায়ক লেন হাটন। প্রায় দু’দিন ব্যাট করেছিলেন। দ্বিতীয় দিন শেষে ইংল্যান্ডের স্কোর ৭ উইকেটে ২৯২। তৃতীয় দিনে তারা ৯ উইকেটে ৩৪৭ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে। এরপর ব্যাট করতে নেমেই ট্রুম্যানের আগুনে ঝলসে যায় ভারত।
তৃতীয় দিনটি ছিল ১৯ জুলাই। লাঞ্চের পর ভারত খেলতে নেমে ৫৮ রানে অলআউট। মাত্র ২১.৪ ওভারে প্রথম ইনিংস শেষ। স্কোরার সংখ্যা বদলানোর সময় পাচ্ছিলেন না। তাই ০ রানে ৪ উইকেট দেখাচ্ছিল। এক ভারতীয় সাংবাদিক সেই ম্যাচ কাভার করছিলেন। দেশে নিজের অফিসে ফোন করে স্কোর জানানোর পর ধমক খেয়েছিলেন। স্পোর্টস এডিটর তাকে প্রশ্ন করেন, ‘০/৪ বলতে কী বুঝাচ্ছ তুমি? তুমি আসলে ৪/০ বুঝাতে চাচ্ছ, তাই না?’
ওপেনার পঙ্কজ রায়, হেমু অধিকারী ও দত্ত ফাডকার শূন্য রানে আউট হন। অধিনায়ক বিজয় হাজারের শরীর খারাপ থাকায় পরে নামবেন বলে প্যাড বাঁধতে দেরি করেন। কিন্তু ভারতীয় ইনিংসে মড়ক লাগায় ১৪ বলের মধ্যেই তাকে মাঠে নামতে হয়। উইকেটে গিয়ে তিনি প্যাডের বকলেস বেঁধেছিলেন। বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ১৬ রানে অ্যালেক বেডসারের বলে আউট হন। সর্বোচ্চ ২২ রান করেছিলেন বিজয় মাঞ্জরেকার।
ভারতের বিপক্ষে সেই সিরিজেই অভিষেক হয়েছিল ট্রুম্যানের। প্রথম টেস্ট খেলেন হেডিংলিতে। গতির ঝড় তুলেছিলেন। প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেট নেওয়ার পর ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছিল। বিজয় হাজারে, ফাডকাড় ও মাঞ্জরেকার ছাড়া কেউ তাকে খেলতে পারছিলেন না। চোখ বন্ধ করে স্কোয়ার লেগ আম্পায়ারের দিকে পিছু হটছিলেন। ট্রুম্যানের গতি থেকে বাঁচতে দলে ফেরানো হয় বিনু মানকাডকে। যদিও ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে তিনি ব্যর্থ হন। অন্য ওপেনার পঙ্কজ রায় পুরো সিরিজেই ব্যর্থ ছিলেন। প্রথমবার ইংল্যান্ডে সিরিজ খেলতে গিয়ে ট্রুম্যানের আগুন তাকে ‘ট্রমার’ মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। প্রথম টেস্টে শূন্য রানে আউট হন পঙ্কজ রায়। পরবর্তী তিন ম্যাচে চার ইনিংসেও শূন্যতে আউট হন। সিরিজে সাত ইনিংসে ৫৪ রান করেন, যার মধ্যে ৫টিই ছিল শূন্য।
হেডিংলির দ্বিতীয় ইনিংসে ট্রুম্যান ৪ উইকেট নেন। অভিষেকে ৭ উইকেট নেওয়ার পর লর্ডসে আবার ভারতকে দগ্ধ করেন। এবার নেন ৮ উইকেট। এরপর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের সেই কীর্তি। প্রথম ইনিংসে ৮ উইকেট নিয়ে ৫৮ রানে ভারতকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর দায়িত্ব নেন বেডসার আর টনি লক। ফলোঅন করতে নেমে দ্বিতীয় ইনিংসে ভারত ৮২ রানে অলআউট। লক আর বেডসার ৯ উইকেট নেন। ট্রুম্যান কেবল পঙ্কজ রায়কে (০) আউট করেছিলেন। সব ওল্ড ট্র্যাফোর্ড টেস্টের তৃতীয় দিনের ঘটনা। এক দিনে দুবার অলআউট ভারত। লজ্জা, লজ্জা।
অভিষেক সিরিজে ট্রুম্যান চার টেস্টে নেন ২৯ উইকেট। ৩-০তে সিরিজ জেতে ইংল্যান্ড। ওভালে শেষ টেস্ট বৃষ্টির কারণে ড্র হয়েছিল। এক ইনিংস বোলিংয়ের সুযোগ পেয়ে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। সিরিজ শেষে তাকে হ্যারল্ড লারউডের সঙ্গে তুলনা করে ডেইলি এক্সপ্রেস লিখেছিল, ‘ফাইন্ডিং এ শক বোলার হু ক্যান নক ওভার দ্য অস্ট্রেলিয়ানস নেক্সট সামার।’
তিনশ টেস্ট উইকেট নেওয়া প্রথম বোলার ট্রুম্যান। ৬৭ টেস্টের ক্যারিয়ারে ২১.৫৭ গড়ে শিকার ৩০৭। উইজডেনের চোখে তিনি ছিলেন ‘ইংল্যান্ডের সর্বশ্রেষ্ঠ ফাস্ট বোলার।’ তার চেয়ে ভালো স্ট্রাইকরেট কেবল ডোনাল্ড, মার্শাল, ওয়াকার আর স্টেইনের। তার চেয়ে কম টেস্ট খেলে ৩০০ উইকেট পেয়েছেন মাত্র ৮ জন। ফার্স্ট ক্লাসে ইয়র্কশায়ারের হয়ে টানা ২১ মৌসুম খেলেছেন। এর মধ্যে ১২ মৌসুম উইকেট শিকারে ‘সেঞ্চুরি’ করেছিলেন। সব মিলিয়ে উইকেট ২৩০৪টি।
১৯৬৮ সালে দুর্দান্তভাবে ক্যারিয়ার শেষ করেন ট্রুম্যান। এরপর বলেছিলেন, ‘আমার রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারবে কি-না জানি না, তবে যেই ভাঙ্গুক সে খুব ক্লান্ত থাকবে।’ ১৯৭২ সালে ৪১ বছর বয়সে অবসর ভেঙে ফিরেছিলেন ফার্স্ট ক্লাসে। কিন্তু সে যাত্রা ভালো হয়নি। ২০০৬-এর ১ জুলাই ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যু হয় ফ্রেড ট্রুম্যানের।