কেবল গানকে কেন্দ্র করে একটি মানুষের বহমান জীবন। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে জীবন নদীর বয়ে চলায় গানকে ধারণ করে আপাদমস্তক ছুটে চলা স্বাপ্নিক এক মানুষ এন্ড্রু কিশোর। স্বাধীন বাংলাদেশের সংগীতে বিরাট এক প্রাপ্তির নাম এন্ড্রু কিশোর। শুধু গান নিয়েই একটা জীবন কাটিয়ে দিলেন অকপটে। গানের মাঝেই খুঁজে নিলেন জীবনের যত গল্প। বলা যায়, তার কাছে গানই হয়ে উঠেছিল-জীবনের আরেক নাম; প্রাণভোমরা। তার প্রস্থান শোকের সাগরে ভাসিয়েছে সংগীত অনুরাগীদের। তার অন্তর্ধানে ভার্চুয়াল মাধ্যমও স্তব্ধ হয়ে উঠে নিঃশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়া পাথুরে গুহার ন্যায়।
ব্যক্তি এন্ড্রু কিশোরের শৈশবেই শুরু হয় প্রায় ১৫ হাজার গানে কণ্ঠ দেওয়া শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের গানের ভুবনে যাত্রা। তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন অর্থাৎ শৈশব থেকেই গান মিশে যায় তার প্রাণের স্পন্দনে। এন্ড্রু কিশোরের বড় বোন ডা. মার্সেলা শিখা বাড়ৈ বিশ্বাস ওস্তাদ আবদুল আজিজ বাচ্চুর কাছে গান শিখতেন আর বড় ভাই স্বপন বাড়ৈ বাজাতেন তবলা। ছোট্ট কিশোর বড় দুই ভাইবোনের হারমোনিয়াম–তবলার অনুশীলন দেখতেন। তবে বড় বোন যখন হারমোনিয়াম নিয়ে বসতেন, তখন এন্ড্রু কিশোর চুপ করে বসে থাকতেন পাশে আর আনমনে হারিয়ে যেতেন সুরের ভুবনে। দিনের পর দিন বড় ভাইবোনের অনুশীলন দেখেই দিন কাটছিল তার। কিন্তু চিকিৎসক বাবা এবং শিক্ষিকা মায়ের উপার্জনে নিম্নমধ্যবিত্ত কিংবা বলা চলে মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েনে একসঙ্গে তিন ভাইবোনের লেখাপড়ার খরচ চালানো খুব কষ্টের হয়ে যাওয়ায় একসময় কিশোরের বড় দুই ভাইবোনকে তার মা-বাবা পাঠিয়ে দেন বরিশাল বোর্ডিং স্কুলে। সেই সঙ্গে ভাগ্য বুঝি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে নিয়ে যায় অন্য ভুবনে। কিশোরের দুই ভাইবোন বরিশালে চলে যাওয়ার পর ওস্তাদ আবদুল আজিজ বাচ্চু তার বাবাকে বলে ছোট্ট কিশোরকেই নিতে চান গান শেখানোর জন্য। যেহেতু তার মা-বাবা দুজনেই ছিলেন সংগীতের সমঝদার। তাই আর বেগ পেতে হয়নি, তার বাবা হাসিমুখে প্রতিদিন সাইকেলে করে ছেলেকে সুরবাণী সংগীত বিদ্যালয়ে ওস্তাদজির কাছে গান শেখাতে নিয়ে যাওয়ার কাজটা আগ্রহ নিয়েই করতে থাকেন। আর ১৯৬৪ সালে এভাবেই সংগীতের হাতেখড়ি হয় কিশোরের। ছোট্ট কিশোর এরপর মন দিয়ে শুধু দুটি জিনিসই করে গিয়েছেন—লেখাপড়া আর সংগীতচর্চা।
এন্ড্রু কিশোরের গান আর লেখাপড়া চলে সমানতালে। কোনোভাবেই কখনো কোনোটায় ছাড় দেননি তিনি। লেখাপড়া বলতে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, সত্যিকারের মানুষ হওয়ার শিক্ষাটাও নিয়েছিলেন পারিবারিকভাবে। কারণ চিকিৎসক বাবা ক্ষিতীশ বাড়ৈ গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার চিথলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও পেশাগত দায়িত্ব রক্ষার্থে স্থায়ী হন রাজশাহীতে। আর মা যেহেতু ছিলেন রাজশাহীর বুলনপুর মিশন গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষিকা, তিনিও মানুষ গড়ার কারিগরের দায়িত্বটি পালন করেছেন গভীর ভালোবাসায়। সব মিলিয়ে কিশোরের জীবন চলে দায়িত্ববোধ আর ভালোবাসার মিশেলে, এভাবে অনার্স ফাইনাল পর্যন্ত। অনার্সের শেষ বর্ষে মৌখিক পরীক্ষা নিতে ঢাকা থেকে এক অধ্যাপক গেলেন। কিশোরকে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে রাজশাহী সিটি কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, ‘এ হচ্ছে আমাদের ছাত্র। সিনেমায় গান গায়।’ শুনে অধ্যাপক বললেন, ‘বাহ, তাহলে ও মাস্টার্সটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই করুক। তাহলে ওর গানের জন্যও সুবিধা হবে।’ শিক্ষক প্রস্তাব দিলেন, ভালো সুযোগ বলা যায়। তবে কাজে লাগানো গেল না তার মায়ের জন্য। তার মা সব সময় বলতেন, ‘মাস্টার্স শেষ করার আগে আমি তোকে ছাড়ছি না।’ ফলে মাস্টার্সের জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হতে হয় তাকে। এ প্রসঙ্গে একবার কোন এক স্মৃতিচারণায় এন্ড্রু কিশোর বলেন, ‘মা আমাকে খুব ভালো একটা শিক্ষা দিয়েছেন জীবনে, তিনি শিখিয়েছিলেন, লেখাপড়াটা জীবনে খুব দরকারি জিনিস। শুধু একাডেমিক শিক্ষা নয়, মনুষ্যত্বের শিক্ষাও। শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতেও শিক্ষাটা আমার খুব কাজে এসেছে।’
এন্ড্রু কিশোর ছিলেন অমায়িক একজন মানুষ। এই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পীদের একজন ছিলেন তিনি, অথচ স্বভাবে ছিলেন মাটির মানুষ। তার কথাবার্তায়, আচরণে যে ব্যাপারটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়তো, তা হচ্ছে বিনয়। সে ক্ষেত্রে ছোট্ট কয়েকটি উদাহরণ না দিলেই নয়! ২০১৩ সালে বাংলাদেশ আইডল নামে একটি প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন, তিনি। সেই প্রতিযোগিতারই একটি পর্বে তিনি বলেন, ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে গান গাইলেও, এখনো নিজেকে কণ্ঠশিল্পী ভাবেন না তিনি, নিজেকে মনে করেন কণ্ঠ শ্রমিক। তিনি বলেন, ‘শিল্পী অনেক বড় ব্যাপার। আমি কষ্ট করে গান গাই। চেষ্টা করি। আমি হচ্ছি শ্রমিক। কণ্ঠশ্রমিক! শিল্পের পর্যায়ে যেতে অনেক সাধনা করতে হবে!’ একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী কতটা বিনয়ী হলে প্রকাশ্যে এমন কথাগুলো বলতে পারেন! অসুস্থ অবস্থায় ২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন এন্ড্রু কিশোর। তার চিকিৎসায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা করেন। তিনি নিতে না চাইলে বঙ্গবন্ধুকন্যা সংস্কৃতিপ্রেমী শেখ হাসিনা তাকে যখন বলেন বড় বোন হিসেবে তাকে তিনি এই টাকাটা দিচ্ছেন, তখন তিনি তা অকপটে গ্রহণ করেন। তার এমন নিখাদ বিনয়, যা আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় তাকে ভাস্বর করে রাখবে অনন্তকাল।
এক সাক্ষাৎকারে এন্ড্রু কিশোর বলেন, ‘জীবনে প্রথম গান গেয়ে ৮০০ টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছিলাম। তবে সেই টাকা হাতে পাইনি। স্কুলের এক বড় ভাই ঢাকা থেকে আসছিলেন। বলে দিলাম, তার কাছে টাকাটা দিয়ে দিন। বন্ধুবান্ধব সবাই মিলে খাওয়াদাওয়া করে সে টাকা শেষ করে দিল।’ জেনেও তিনি কখনো কিছু বলেননি সেই বড় ভাই বা কাউকে; ভাবা যায় এমন বিনয়! তার বাবা ক্ষিতীশ বাড়ৈ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর রাজশাহীতে কর্ম জীবন শুরু করলেও প্রতিবছরই পরিবার নিয়ে জন্মস্থান গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় যেমন বেড়াতে আসতেন। এন্ড্রু কিশোরও বাবার মতো জন্মশহর রাজশাহী এবং বাবার বাড়ি কোটালীপাড়ায় নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। সুনাম বা খ্যাতি তাকে অহংকারী করতে পারেনি। পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি আত্মীয়দের সহযোগিতা করতেন। আবার কারণে-অকারণে বিভিন্ন সময় ফোন করে সবার খোঁজখবর নিতেন। তিনি ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চুর নামে রাজশাহীতে যেমন ‘ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চু স্মৃতি সংসদ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। তেমনি ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে সস্ত্রীক চিথলীয়া গ্রামের পৈতৃক ভিটায় বেড়াতে গিয়ে ‘প্রার্থনা কুঞ্জ’ নামে একটি উপাসনালয় করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
এন্ড্রু কিশোর এমন এক প্রতিভা, যার কণ্ঠ প্রায় সবার সঙ্গেই মানিয়ে যেতো খুব সহজেই। তাই বুঝি অগ্রজ-অনুজের বেড়াজাল ভেদ করে অনেক নায়কই তার গানে পর্দায় ঠোঁট মিলিয়েছেন প্রাণ খুলে। আর তিনিও গানে প্রাণ সঞ্চার করেছেন আপন মনে। অর্থাৎ চলচ্চিত্রের গানে তিনি যেন একেবারে বাংলার রাজতিলক৷ তাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানের জগতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন, যাকে আমরা এক কথায় বলতে পারি কমন সিঙ্গার। আর সেই সর্বজনীন কণ্ঠই তাকে করে তুলেছে প্লেব্যাক জগতের মুকুটহীন সম্রাট। যিনি বহু গান উপহার দিয়েছেন আমাদের। সংগীতের তন্ত্রবদ্ধ আকাশে মুগ্ধ করে রেখেছেন কয়েক প্রজন্ম। অথচ গানের তরী পাড়ে না ভিড়িয়ে নন-হজকিন লিম্ফোমা নামক ব্লাড ক্যানসারের হাত ধরে খুব বেশিই তাড়াহুড়ো করে করোনাকালীন এই ক্রান্তিতে আমাদের গানের পাখি এন্ড্রু কিশোর পিঞ্জর ভেঙে ডানা মেলে উড়াল দিলেন অজানা পৃথিবীতে।