চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বছর দুয়েক আগের বাণিজ্যযুদ্ধ মাঝে কিছুটা প্রশমিত হয়ে এলেও করোনা পরিস্থিতি দুই দেশের উত্তেজনার পালে নতুন হাওয়া দিয়েছে। চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক দোষারোপ এবং চীনের তরফে তার পাল্টা জবাব এতদিন স্নায়ুচাপ বাড়িয়েছে শুধু। তবে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে চীনা দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়ার পর তা এক প্রকার স্নায়ুযুদ্ধ বা শীতলযুদ্ধে রূপ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওই সিদ্ধান্তের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে গতকাল চীন তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শহর চেংডুর মার্কিন দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনায় চলমান ‘শীতলযুদ্ধে’ উষ্ণতা ছড়িয়েছে।
দূতাবাস বন্ধের পর গতকাল চীন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে চীনা দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের ‘অত্যাবশ্যক প্রতিক্রিয়া’ ছিল এটি। আর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হিউস্টনের দূতাবাস বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কারণ চীন বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ‘চুরি’ করছিল।
বিবিসি বলছে, বাণিজ্য এবং করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন বারবার পেইচিংয়ের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। পাশাপাশি হংকংয়ে চীনের বিতর্কিত নিরাপত্তা আইন জারি করা নিয়েও চীনের সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, দূতাবাস বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ‘যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া অযৌক্তিক পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় যথাযথ এবং জরুরি’ পদক্ষেপ। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বর্তমান পরিস্থিতি যে রকম, চীন তা চায় না। আর এর পুরো দায়ভার যুক্তরাষ্ট্রের।
চেংডুর মার্কিন দূতাবাস ১৯৮৫ সালে স্থাপন করা হয়েছিল এবং বর্তমানে এখানে কর্মকর্তা, স্টাফ মিলিয়ে ২০০র বেশি মানুষ কাজ করে। বিবিসি প্রতিনিধিদের মতে, স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতের নিকটবর্তী হওয়ায় এই দূতাবাসটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চীনকে জানানো হয় যে, এই সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগে টেক্সাসের হিউস্টনের চীনা দূতাবাস বন্ধ করে দিতে হবে। সেদিন সন্ধ্যায়ই অজ্ঞাত কয়েকজন ব্যক্তিকে হিউস্টনের ওই ভবনের চত্বরে কাগজ পোড়াতে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পাঁচটি দূতাবাসের একটি ছিল টেক্সাসের হিউস্টনের দূতাবাসটি। তবে কেন ওই একটি দূতাবাসই বন্ধ করার সিদ্ধান্ত দেওয়া হলো, তা পরিষ্কার নয়।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মার্কিন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করেছেন যে, দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দেখানো কারণ ‘অবিশ্বাস্যরকম হাস্যকর’।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। প্রথমত, মার্কিন কর্মকর্তারা সারা বিশ্বে কভিড-১৯ ছড়িয়ে যাওয়ার দায় চাপিয়েছেন চীনের ওপর। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন অভিযোগ তুলেছেন যে ভাইরাসটি চীনের ল্যাবরেটরি থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যদিও তার নিজের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই বলেছে ভাইরাসটি ‘মানবসৃষ্ট বা জিনগতভাবে পরিবর্তিত’ নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই অন্যায্যভাবে বাণিজ্য পরিচালনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরির অভিযোগ তুলেছেন। তবে পেইচিংয়ের একটি ধারণা হলো, অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে চীনের উত্থান ঠেকানোর চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। আর দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক দ্বন্দ্বের কারণ হংকংয়ে চীনের জারি করা নিরাপত্তা আইন। এই আইন বাস্তবায়ন করার পর যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলের বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধা বাতিল করে। অথচ চীনের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে তাদের ঘরোয়া বিষয়ে ‘হস্তক্ষেপ’-এর শামিল, সময়মতো সমুচিত জবাব দেওয়া হবে।