বাংলাদেশের ক্রিকেটে তখন ঘোর অমানিশা। ২০০৩ বিশ্বকাপে চরম হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর জাতীয় ক্রিকেটে রদবদল অনিবার্য। শ্রীলঙ্কাকে ১৯৯৬ বিশ্বকাপ জেতানো কোচ ডেভ হোয়াটমোরকে নিয়ে আসে বিসিবি। ঘুরে দাঁড়াতে নেতৃত্বের ব্যাটন তুলে দেওয়া হয় খালেদ মাহমুদের হাতে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের বাঁক বদলের অনেক গল্পের সঙ্গে অবশ্য ‘সুজন’ নামে পরিচিত এই ক্রিকেটারের নাম।
আজ ২৬ জুলাই। ৪৯ বয়সে পা রাখলেন বহু আগে খেলা ছাড়ার পরও ঢের আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্কের মধ্যে থাকা সুজন। বাংলাদেশের তৃতীয় টেস্ট অধিনায়ক তিনি।
টেস্ট পারফরম্যান্স, নেতৃত্ব কিংবা সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তার নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যানে কোনোভাবে সফল সুজনকে আপনি খুঁজে পাবেন না। জানতে চাইলে ইতিহাস খুঁড়ে আপনাকে বের করে আনতে হবে খেলোয়াড়ি জীবনে ‘ফাইটার’ হিসেবে সমান পরিচিত সুজনকে।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে টিনেজার সুজন ছিলেন ঢাকার যে কোনো মাঠের ক্রিকেটে প্রতিপক্ষের কাছে এক আতঙ্ক। ছোট গড়নের বিশাল হৃদয়ের এক অলরাউন্ডার। প্রকৃতিপ্রদত্ত প্রতিভার চেয়ে পরিশ্রম আর চেষ্টায় নিজেকে শাণিত করে তোলার দক্ষতা ছিল তার। ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে অনেক গুণের প্রকাশ। সহজাত নেতা। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে জানেন। ১৯৯৮ সালে চমৎকার ওয়ানডে অভিষেকের পর ১৯৯৯ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে হয়ে যান ইতিহাস স্রষ্টা।
সেবারই প্রথম বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানকে সেই আসরে হারিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয় লাল-সবুজের দল। গোটা বাংলাদেশকে উৎসবে মাতানো সেই ম্যাচে সুজন হয়েছিলেন ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’। ২৭ রান এসেছিল ব্যাট থেকে। বল হাতে ১০ ওভারে ৩১ রানে ৩ উইকেট তার।
সুজনকে অবশ্য আরও মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের প্রথম ‘আনন্দ বেদনার কাব্য’র জন্য।
পাকিস্তানের বিপক্ষে মুলতান টেস্ট বাংলাদেশের জন্য চিরকালীন দুঃখ হয়ে রইবে। সেই প্রথম সত্যিকার অর্থে কোনো টেস্টে জয়ের খুব কাছে গিয়েছিল টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর ওই সংস্করণে লাগাতার ব্যর্থতার জন্য সমালোচনায় ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ দল। ২০০৩ সালের সেই সফরে সুজন অধিনায়ক। মুলতানে জয়ের খুব কাছে গিয়েও ১ উইকেটে হারতে হয় ইনজামাম উল হকের বীরত্বে। কান্নায় ভেঙেছিলেন সুজন দলবল নিয়ে। অথচ ম্যাচটিতে ৭ উইকেট নিয়েছিলেন সুজন।
হোয়াটমোর যেমন ক্রিকেটার চাইতেন সুজন তখন ক্যারিয়ারের প্রায় শেষটায় পৌঁছে তেমন ছিলেন না। তবু মেনে নিয়ে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরেছিলেন বাংলাদেশের কোচ। কিন্তু এরপর নেতৃত্ব বদল হয়। ২০০৬ এ শেষ ওয়ানডে খেলে মাঠ থেকে বিদায় নিতে পারলেও ২০০৩ এর শেষ থেকে পরে আর কোনো টেস্ট খেলা হয়নি সুজনের।
৯ টেস্ট ও ১৫ ওয়ানডেতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সুজন। ১০০ শতাংশ হার দলের। কিন্তু সুজনের নেতৃত্বে সেই সময়ে ভাঙাচোরা বাংলাদেশ ফিরেছিল লড়াইয়ে। পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল দল। ১২ টেস্টে ২৬৬ রান, নামের পাশে ১৩ উইকেট, ৭৭ ওয়ানডেতে ৯৯১ রান ও ৬৭ উইকেটও কোনো পারফরমারের কথা বলে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই সময়ে বাংলাদেশের সুজনের এমন পরিসংখ্যানের দাম ছিল।
খেলা ছাড়ার পর কোচিংয়ে গেছেন। আবাহনীর চ্যাম্পিয়ন কোচ। এখন সুজনের অনেক পরিচয়। বিপিএলে ঢাকার কোচ। বিসিবির পরিচালক। বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ যুব দলের এই বছর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের পেছনেও সুজনের বড় অবদান। আরও অনেক কিছুর সঙ্গে তিনি। ছিলেন জাতীয় দলের ম্যানেজার। এক সময় জাতীয় দলের সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান কোচের দায়িত্ব পালনের সুখস্মৃতিও আছে।
সেই সুজন এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত ট্রলের শিকার। গতিদানব, গদা, ক্ষমতালোলুপ থেকে নানা নামে ডাকা হয় তাকে। কিন্তু এসব সমালোচনা বা নিন্দামন্দের পরও বাংলাদেশের ক্রিকেটে সুজনের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। এদেশের ক্রিকেট ইতিহাস লিখতে গেলে অনেকগুলো অধ্যায়ে আসবে তার নাম।