শুভ জন্মদিন ক্রীড়াঙ্গনের ধূমকেতু

আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই শেখ কামালের পরিচিতি। কিন্তু দেশের ক্রীড়াঙ্গনে শেখ কামালের আবির্ভাব ঘটেছিল ধূমকেতুর মতো। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হলেও খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চাতেই বেশি ঝোঁক ছিল তার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠপুত্রের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে স্বল্প সময়ের পথচলা ও ভাবনা তুলে আনার চেষ্টা করেছেন জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক সনৎ বাবলা তার ‘শেখ কামাল : ক্রীড়াঙ্গনের ধূমকেতু’ শীর্ষক ১১১ পৃষ্ঠার বইয়ে। গত একুশে গ্রন্থমেলায় বইটি প্রকাশ করে কথাপ্রকাশ।

বইটি পড়ার পর পাঠকমনের অনেক প্রশ্নেরই উত্তর মিলবে অনেকের জবানিতে। শেখ কামালকে জানতে লেখক পৌঁছে গেছেন এমন সব মানুষের কাছে যারা তাকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। এই তালিকায় ছিলেন ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন, সাবেক ফুটবলার গোলাম সারওয়ার টিপু, আবাহনীর প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য শেখ আশরাফ আলী, সাইদুর রহমান প্যাটেল, ব্রাদার্স ইউনিয়নের আবদুস সালাম, সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব ডলি জহুর, বাল্যবন্ধু সাখাওয়াত মুবিন চৌধুরী, ডিপ্লোম্যাট রুহেল আহমেদ বাবু, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ম্যানেজার তানভীর মাজহার তান্না, বিশ^বিদ্যালয়ের সহপাঠী তওরিক হুসেইন বাদল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা খুকীর বান্ধবী রওশন আক্তার ছবি নাজমা চৌধুরী। এছাড়া দেশের প্রথিতযশা ক’জন আলোকচিত্রীর দুর্লভ কিছু ছবিও ছাপা হয়েছে বইটিতে।

১৩টি ছোট ছোট অধ্যায়ে লেখক শেখ কামালের ক্রীড়াসত্তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। আবাহনী ক্লাবের সামনের মাঠ রক্ষায় আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল শেখ কামালের পথচলা। স্বাধীন দেশে আবাহনীর নবযাত্রায় তার ভূমিকা, সমাজ বদলে শেখ কামালের অবদান, আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রাণের আবাহনীকে গড়ে তোলার স্বপ্ন, দেশের ফুটবলে প্রথম বিদেশি কোচ নিয়ে আসা, আবাহনীকে একটা দর্শকপ্রিয় দল হিসেবে গড়ে তুলতে তার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা, শেখ কামালের মিউনিখ অলিম্পিক দর্শন, ব্রাদার্স ইউনিয়নের তারুণ্যে আকর্ষণের মতো অনেক অজানা গল্পই উঠে এসেছে বইটিতে। সনৎ বাবলা বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য এই ৫ আগস্ট শেখ কামালের জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে কমপক্ষে ১০ বার গিয়েছি আবাহনী ক্লাবে। প্রতিবার অল্প কিছু বাধাধরা কথাই শুনেছি। তার সম্পর্কে আসলে নতুন কিছু জানার আগ্রহ আসলে ওই অনুষ্ঠানে গিয়ে পাইনি। গতবার সমর্থকগোষ্ঠী শেখ কামালের কিছু আলোকচিত্রে ক্যাপশন দিয়ে কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল। সেগুলো দেখার পর মনে হলো মানুষটা সম্পর্কে আরও জানার আছে। সেটা জানতে গিয়েই শেখ কামালকে নতুনভাবে আবিষ্কার করি। তাকে নিয়ে অনেক প্রোপাগা-া ছিল, সেগুলোর সত্যতা খুঁজে বের করার, ২৬ বছরের জীবনে একটা মানুষ কত কিছু করতে পারে, তার খোঁজ নিতে অনেকের সঙ্গে কথা বলি। ক্রীড়াঙ্গনের অনেকে তো ছিলেনই, ক্রীড়াঙ্গনের বাইরের অনেকের সঙ্গে কথা বলে শেখ কামালকে চিনেছি অন্যভাবে। সেগুলোই চেষ্টা করেছি বইটিতে তুলে ধরতে। কাজ করতে গিয়ে জেনেছি, একটি ক্লাব চালাতে হলে অনেক টাকার দরকার হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছেলেকে ডোনেশন দেওয়ার লোকের অভাব ছিল না। কিন্তু তিনি কারও ডোনেশন না নিয়ে সার্কাস আয়োজন করে তহবিল সংগ্রহ করেছেন। তখন মোহামেডানের মতো জনপ্রিয় দল ছেড়ে অনেক তারকা ফুটবলার আবাহনীতে আসতে চাননি। তাদের নানাভাবে আবাহনীর প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিলেন কামাল। ফুটবলারদের মোটরবাইক উপহার দেওয়ার কথা বলে চুক্তি করতেন।’ বাবলা বলেন, ‘আবাহনীকে একটি আধুনিক ফুটবল দল হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টার কমতি ছিল না শেখ কামালের। সত্তরের দশকে দেশীয় ফুটবলে শৈল্পিক ছোঁয়া লাগেনি। খানিকটা ওয়ার্মআপ করে ম্যাচ খেলতে নেমে পড়া। পাসিং ফুটবলের বালাই ছিল না। কিন্তু কামাল চেয়েছিলেন আবাহনী শৈল্পিক ফুটবল খেলুক। তাই তিনি সে সময় এক আইরিশ ভদ্রলোককে আবাহনী ক্লাবে নিয়ে আসেন। যার ইউরোপিয়ান ফুটবলের ওপর বিশেষ জানাশোনা ছিল। উইলিয়াম বিল হার্টের কোচিং সার্টিফিকেট না থাকলেও দেশের ফুটবলের স্টাইলে পরিবর্তন আনার জ্ঞানটুকু ছিল। সেটাই তিনি সে সময়ের ফুটবলারদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে আবাহনীই প্রথম ঢাকার মাঠে পাসিং ফুটবল খেলতে শুরু করে চমকে দিয়েছিল। আবাহনীর ফুটবলারদের জন্য দেশের বাইরে থেকে জার্সি, বুট নিয়ে আসা, দামি এডিডাস বল দিয়ে অনুশীলন করার ব্যবস্থা করেছিলেন শেখ কামাল।’ একটি নতুন ক্লাবকে জনপ্রিয় করে তুলতে অনেক চেষ্টা ছিল শেখ কামালের। জাতীয় বাস্কেটবল দলের সাবেক অধিনায়ক এ কে সরকারের জবানিতে বাবলা বলেন, ‘আবাহনী তখন ঢাকার মাঠে নতুন একটি দল। সমর্থকের চেয়ে বিরোধীর সংখ্যাই তখন বেশি। কিন্তু কামাল আবাহনীকে একটি সমর্থনপুষ্ট দল হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। সে সময় ওয়ান্ডারার্স খুব জনপ্রিয় ক্লাব। আবাহনীর সঙ্গে খেলা হলেই ওয়ান্ডারার্স সমর্থকদের ইট-পাটকেলের পাশাপাশি গাল-মন্দ খেতে হতো আবাহনীর ফুটবলারদের। একদিন শেখ কামাল ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে গেলেন। গিয়ে বললেন তিনি ওয়ান্ডারার্সের হয়ে বাস্কেটবল খেলতে চান। খেলাটা তিনি খুব ভালো খেলতেন। তাই তাকে নিয়ে নেওয়া হলো। এক বছর পর কামালের কাছে একে সরকার জানতে চাইলেন আবাহনী রেখে কেন তিনি ওয়ান্ডারার্সের হয়ে খেলতে এলেন। কামাল বললেন, আসলে আমি এই দলে খেলছি বলে ফুটবল মাঠে ওয়ান্ডারার্সের সমর্থকরা এখন আর খুব বেশি আবাহনীর ফুটবলারদের ওপর চড়াও হয় না। কামাল ছিলেন দূরদর্শী একজন সংগঠক। যদিও জীবিত অবস্থায় আবাহনীকে তুমুল সমর্থনপুষ্ট রূপে দেখে যেতে পারেননি।’

অল্প বয়সেই ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে বেশ কিছু ভূমিকা কামাল রেখেছেন। বাবলা বলেন, ‘নিজে আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা হলে কী হবে, সরকারের কাছ থেকে অন্যান্য ক্লাবকেও আর্থিক অনুদান পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করে। তাছাড়া ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের প্রতি কামালের একটা দুর্বলতা ছিল। ব্রাদার্স ছিল মহল্লাভিত্তিক একটা দল। মহল্লার তরুণদের নিয়ে দলটি সাফল্য পেত। কীভাবে হলো জানতে ব্রাদার্স ক্লাবে যেতে হলো। আসলে তিনি ধানম-ির তরুণদের নিয়েই আবাহনীকে শক্তিশালী করে তুলতে চেয়েছিলেন। পিতার ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি চাননি আবাহনীকে উন্নত করতে। তিনি বেঁচে থাকলে দেশের ক্রীড়াঙ্গন বিশেষ করে ফুটবলের মান আরও ওপরে থাকত।’

‘শেখ কামাল : ক্রীড়াঙ্গনের ধূমকেতু’ বইটির পেছনের মলাটে লেখক মন্তব্য করেছেন, ‘ক্ষণকালের জন্য তিনি এসেছিলেন, তার জাদুকরীতে হয় নতুন ইতিহাস। এরপর শেখ কামাল এক আফসোসের নাম।’ সত্যিই শেখ কামাল এক আফসোস হয়ে মিটিমিটি জ্বলছেন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের আকাশে।