ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। উড়োজাহাজে ভ্রমণের সময় এক পত্রিকায় পারভীন ববির ছবি দেখে ঠিক করেন ভারত যাবেন। পরে হিন্দি সিনেমার অভিনেতা হিসেবে খ্যাতি পান এই বিদেশি।
পুরো নাম রবার্ট জন ক্রিস্টো। জন্ম ১৯৩৮ সালে, সিডনিতে। পড়াশোনার জন্য তিনি পাড়ি দেন জার্মানি। সেখানে থিয়েটারেও অভিনয় করতেন। তখন আলাপ জার্মান তরুণী হেলগার সঙ্গে। তারা বিয়েও করেন। কিন্তু ১৯৭৪ সালে দুই মেয়ে, এক ছেলে ও স্বামীকে রেখে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান হেলগা।
এর পর ববের জীবন অনেকটাই এলোমেলো হয়ে যায়। তিন সন্তানকে এক মার্কিন দম্পতির জিম্মায় রেখে চলে যান ভিয়েতনাম। মার্কিন সেনাবাহিনীর হয়ে ল্যান্ড মাইন খোঁজার কাজ করতেন।
সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগে ঘড়ি এবং গাড়িও বিক্রি করেছেন তিনি। যুদ্ধফেরত বব মন দিলেন মডেলিংয়ে। সেই সঙ্গে এক বন্ধুর পরামর্শে সিনেমার সেট তৈরির কাজ শুরু করলেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে অভিনেতা হয়ে ওঠার পরামর্শ দেন ওই বন্ধু।
সিনেমার সেট তৈরির কাজে বব একবার গিয়েছিলেন ফিলিপাইন। সেখানে মার্লন ব্র্যান্ডোর ছবির সেট তৈরি করেন। ছোট একটি ভূমিকায় অভিনয়ও করেন। ওই সময় মারিয়া নামের এক তরুণীর সঙ্গে প্রেম হয়। মারিয়া গর্ভবতীও হয়ে পড়েন কিন্তু কাজের জন্য বব পাড়ি দেন মাসকট। তার কথায় ও উদ্যোগে নিজের ছোটবেলার বন্ধুকে বিয়ে করেন মারিয়া।
মাসকট যাওয়ার পথে দুবাই বিমানবন্দরে ববের হাতে আসে ‘টাইম’ পত্রিকার একটি সংখ্যা। সেখানে হিন্দি ছবির ওপর একটি নিবন্ধে পড়েন বব ক্রিস্টো। লেখার সঙ্গে ছিল পারভীন ববির ছবি। তার সঙ্গে দেখা করবেন বলেই বব ভারতে চলে আসেন।
মুম্বাইয়ে কাউকেই চিনতেন না বব। সমুদ্র ভালোবাসতেন বলে সৈকতে বসে থাকতেন। একবার জুহুতে আলাপ হয় তথ্যচিত্র নির্মাতা প্রেম কাপুরের সঙ্গে। সেই আলাপের সূত্রে প্রেম ও ক্যামেরাম্যান জুবের খানের মাধ্যমে পারভীন ববির সঙ্গে দেখা বব ক্রিস্টোর।
কিন্তু ‘দ্য বার্নিং ট্রেন’ ছবির শুটিংয়ে স্বপ্নের নায়িকাকে প্রথমে দেখে বব কিন্তু চমকে যান। বিশ্বাসই করতে পারেননি ওই তরুণী আসলে পারভীন। এমন প্রতিক্রিয়ায় নায়িকা জানান, তিনি শুটিং ছাড়া মেকআপ করেন না। তাদের বন্ধুত্ব বজায় ছিল দীর্ঘদিন।
একবার মুম্বাইয়ে হঠাৎই এক লেখকের সঙ্গে আলাপ হয় বব ক্রিস্টোর। তার সূত্র ধরে রাজস্থানে সঞ্জয় খানের ‘আবদুল্লাহ’ ছবির শুটিংয়ে যান। ববের ব্যক্তিত্ব ও কথাবার্তা মুগ্ধ হয়ে যান সঞ্জয়। ববকে ওই ছবিতে অভিনয়ের অফার দেন। শর্ত রাখেন, ন্যাড়া হতে হবে এবং দাড়ি রাখতে হবে। ববের ভূমিকা ছিল জল্লাদের। তখন তার নাম রবার্ট থেকে হয়ে যান বব।
পরে সঞ্জয় খানের টিভি সিরিয়াল ‘দ্য গ্রেট মারাঠা’য় আহমেদ শাহ আবদালির ভূমিকায় অভিনয় করে খ্যাতি পান বব ক্রিস্টো। তার আগে ‘দ্য সোর্ড অব টিপু সুলতান’-এও অভিনয় করেন।
সঞ্জয়ের সূত্রে ফিরোজ খানের সঙ্গে আলাপ বব ক্রিস্টোর। ফিরোজ তাকে সুযোগ দেন ‘কুরবানি’ ছবিতে। ক্রমে বলিউডে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন বব। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে খলনায়ক ছাড়া অন্য ভূমিকায় অভিনয় করেননি। তার উল্লেখযোগ্য অন্য ছবি হলো কালিয়া, নমক হালাল, স্টার, তাকদির, নাস্তিক, জানি দোস্ত, ডিসকো ড্যান্সার, বক্সার, অগ্নিপথ, গুপ্ত, প্রেম, রূপ কি রানি চোর কা রাজা ও মিস্টার ইন্ডিয়া। ইংরেজি টানে হিন্দি উচ্চারণের জন্য অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকের ভূমিকাতেও অভিনয় করেছেন বব।
নানান ধরনের শারীরিক সমস্যার কারণে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে অভিনয় কমিয়ে দেন তিনি। ২০০১ সালে ‘কসম’ মুক্তি পাওয়ার পরে দীর্ঘদিন অভিনয় করেননি বব। শেষ ছবি ‘আসন কে ফরিস্তে’ মুক্তি পায় মৃত্যুর পাঁচ বছর পর।
২০০০ সালে তিনি মুম্বাই ছেড়ে চলে যান বেঙ্গালুরু। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যোগাযোগও কমিয়ে দেন। বেঙ্গালুরুতে সঞ্জয় খানের বিলাসবহুল হোটেলে যোগব্যায়ামের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু ২০০৬ সালে সঞ্জয়ের সঙ্গে তার তীব্র বাদানুবাদ হয়। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়। হোটেলের চাকরি ছেড়ে দেন বব। এরপর আত্মজীবনী লেখায় মন দেন। সেখানে নিজের অভিনয় জীবনের অনেক বর্ণময় ঘটনা আছে। ২০১১ সালের ২০ মার্চ বেঙ্গালুরুর এক হাসপাতালে মারা যান।
বব ভারতে রেখে যান তার দ্বিতীয় স্ত্রী নার্গিস, দুই ছেলে এবং অসংখ্য ভক্তকে। নার্গিসেরও এটা দ্বিতীয় বিয়ে। তার প্রথম পক্ষের ছেলেকেও আপন করে নিয়েছিলেন বব।