বিদেশ থেকে ফেসবুকের ফোনে ভারতে আত্মহত্যা ঠেকাল পুলিশ

দিল্লির এক ব্যক্তি ফেসবুক লাইভ করে আত্মহত্যার চেষ্টা করছেন। আয়ারল্যান্ডের ফেসবুক দপ্তরের এক কর্মকর্তা তা জানতে পেরেই ফোন করেন দিল্লি পুলিশকে। এরপর দিল্লি পুলিশের সাইবার সেলের এক ইন্সপেক্টর ও তার স্ত্রী সারারাতের চেষ্টা ও মুম্বাই পুলিশের সক্রিয় সহয়োগিতায় প্রাণ বাঁচল ২৫ বছর বয়সের এক ব্যক্তির।

শনিবার সন্ধ্যার ঘটনা। আত্মহত্যা করার আগে এক ব্যক্তি একাধিক ফেসবুক লাইভ করেন। প্রযুক্তির মাধ্যমে তা জানতে পারেন আয়ারল্যান্ডে ফেসবুকের এক কর্মকর্তা। দেরি না করে তিনি ভারতীয় সময় শনিবার সন্ধ্যা ৭.৫১ নাগাদ ফোন করে সম্পূর্ণ বিষয়টি জানান দিল্লি পুলিশের সাইবার সেলের ডিসিপি অন্বেশ রায়কে।

অন্বেশ রায় জানান, ফেসবুকের দফতর থেকে ফোন আসে, জানায় যে দিল্লির বাসিন্দা কোনও এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করতে চলেছেন এমন ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। যে অ্যাকাউন্ট থেকে ফেসবুক লাইভ করা হয় তার আইপি, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও লাইভ ভিডিও গুলো দেওয়া হয় সংস্থার পক্ষ থেকে। এই সব ক্ষেত্রে সময় খুবই মূল্যবান। তাই পরক্ষণেই আমরা ওই নম্বর ট্র্যাক করা শুরু করি।

খোঁজখবরের পর জানা যায় যে ওই নম্বর পূর্ব দিল্লির মান্দওয়ালির। পূর্ব দিল্লির ডিসিপি জসমিত সিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সাইবার সেলের ডিসিপি অন্বেশ রায়।

জসমিত সিং বলেন, মধুবিহারের স্টেশন অফিসার এরপরই ওই অঞ্চলে পৌঁছে যায়। দেখেন সেটি এক মহিলার নম্বর। তবে ওই ভিডিও সম্পর্কে তার কোনও ধারণা নেই। মহিলা জানিয়েছিলেন, নম্বরটি তারই নামে নথিভুক্ত রয়েছে, কিন্তু সেটি ব্যবহার করেন তার স্বামী। তবে, দু’জনের মধ্যে ঝগড়ার পর ওই ব্যক্তি মুম্বাইতে চলে গিয়েছেন। তারপর সে কোথায় রয়েছে সে সম্পর্কে মহিলা কিছুই জানেন না।

সময় ক্রমশ এগিয়ে চলেছে। যেকোনও সময় ঘটে যেতে পারে দুর্ঘটনা। তাই দিল্লি পুলিশের ডিসিপি অন্বেশ রায় যোগাযোগ করেন মুম্বাই পুলিশের সাইবার সেলের ডিএসপি ড. রশমি কোরান্ডিকার সঙ্গে। তার কথায়, দিল্লিতে বসবাসকারী মহিলা তার স্বামীর মোবাইল নম্বর দিয়েছিলেন। কিন্তু, সেখানে যতবারই ফোন করা হয় দেখা যায় সেটি হয় বন্ধ, নয়তো ধরছেন না। তারই মধ্যে আমি ও আমার দলের সদস্যরা মোবাইল ব্যবহারকারীর এলাকা খুঁজে বার করার চেষ্টা করতে থাকি। মুম্বাই সাইবার সেলের ইন্সপেক্টর প্রমোদ খোপিকার ওই ব্যক্তি ও তার স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে যান।

ইন্সপেক্টর খোপিকার জানান, তিনি বাড়িতেই ছিলেন। স্ত্রী ও বাড়ির বাকি সদস্যদের সঙ্গে বসে রাতের খাবার খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময়ই ডিসিপি তাকে ফোন করেন। সব শুনে খোপিকার বেশ কয়েকবার ব্যক্তির ব্যবহার করা মোবাইলে ফোন করেন। কিন্তু, ওই ব্যক্তি ফোন ধরেননি। তারপর ব্যক্তির স্ত্রীকে পুলিশের তরফে জানানো হয়, স্বামীর উদ্দেশ্যে হোয়াটঅ্যাপে সংবেদনশীল ভয়েস নোট ছেড়ে রাখতে। একই সঙ্গে তাদের সন্তানের ছবি পাঠাতে। স্বামী হোয়াটসঅ্যাপ দেখলেই তা পুলিশকে জানানোর জন্যও বলা হয়।

প্রায় রাত সাড়ে ১১টার সময় স্ত্রী জানান তিনি হোয়াটস্যাপ দেখেছেন। তখনই তাকে ফোন করতে বলি। সঙ্গে আমাকেও কনফারেন্স কলে ধরতে পরামর্শ দেই। কিন্তু সেই পরিকল্পনা সফল না হওয়ায় আমিই ওই ব্যক্তিকে ফোন করি এবং মহিলাকে কনফারেন্সে ধরিয়ে দেই। ফোনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাদানুবাদের মধ্যেই ততক্ষণে আমাদের দল ব্যক্তিটি কোন অঞ্চলে রয়েছেন তা জানতে পেরে যায়। জানা যায় যে ওই ব্যক্তি ভায়ান্ডারে আছেন, স্থানীয় পুলিশকে দ্রুত সেখানে পৌঁছতে বলা হয়। এমনটাই জানান ইন্সপেক্টর খোপিকার।

করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনের কারণে ওই ব্যক্তির আয় কমেছে। যা ঘিরেই সংসারে অশান্তি, স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া। এছাড়া সংক্রমণের জেরে অত্যন্ত উদ্বিগ্নতার জন্যই তার আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বলে জানান ওই ব্যক্তি। ফোনে কথা বলে ব্যক্তিকে ব্যস্ত রাখতে বলা হয়েছিল তার স্ত্রীকে। পুলিশও ওই ব্যক্তিকে জানায় যে, তার স্ত্রী, পুলিশ তাকে ভালোবাসেন। তার পিছনে সবাই রয়েছে।

যদিও নিজের আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এরপর উপায় না দেখে ইন্সপেক্টর খোপিকার তার স্ত্রীকে ওই ব্যক্তির কাউন্সেলিংয়ের দায়িত্ব নিতে বলেন। খোপিকার বলেন, আমার স্ত্রী ওই ব্যক্তি ও তার স্ত্রীকে বলেন আমরা দু’জনে লড়াই ঝগড়া করেও কীভাবে একসঙ্গে জীবন কাটাই। আমি করোনা সংক্রমিত হয়েছি বলেও আমার স্ত্রী মিথ্যা কথা বলতে বাধ্য হন। আর্থিক দৈন্যতা ঘোচাতে জানায় যে, আমাদের একটি গাড়ি রয়েছে প্রয়োজনে সেটি চালাতে পারে ওই ব্যক্তি। সাহস ও আস্থা যোগাতে সবসময় বলা হয় পুলিশ তাদের সঙ্গে রয়েছে।

এইভাবেই বেশ কয়েকঘন্টা কেটে যায়। রাত প্রায় ৩টা নাগাদ মুম্বাই পুলিশ ওই ব্যক্তির বাড়িতে পৌঁছায়। দেখা যায় ব্যক্তি বছর ২৫ এর এক তরুণ। খোপিকান্দের কথায়, যখন দেখি সব ঠিকঠাক রয়েছে তখন আমি ফোন ছাড়ি। রবিবার সকাল ১০টা নাগাদ আমি আবার তাকে ফোন করি। যদিও আমি এখনও তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি।

ওই তরুণ পুলিশকে একাধিকবার ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।