নিভৃতচারী এক ক্রিকেটার শিবনারায়ণ চন্দরপল

উইন্ডিজের হয়ে দেড় শতাধিক টেস্ট খেলেছেন। অথচ শিবনারায়ণ চন্দরপল বললেই মনে পরে তার অদ্ভুত ব্যাটিং স্টান্স, ক্রিজের মাটিতে বেল ঠোকা আর চোখের নিচে উল্কি। কিন্তু যা ক্রিকেট খেলেছেন তাতে উইন্ডিজ তো বটেই গোটা দুনিয়াতেই চন্দরপল বন্দিত হতে পারতেন। হননি। উল্টো অপমানজনকভাবে অবসর নিতে বাধ্য হয়েছেন।

এই গায়ানিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তি ২২ বছর। শচিন টেন্ডুলকারের সমান। ঝুলিতে ১৬৪ টেস্টে ১১,৮৬৭ রান, যা ব্রায়ান লারার চেয়ে মাত্র ৮৬ রান কম। ৩০টা সেঞ্চুরি। ৬৬টা হাফ সেঞ্চুরি। গড় ৫১.৩৭। শুধু টেস্টে নয়, উইন্ডিজের হয়ে ওয়ানডে দলেও সমান কার্যকরী ছিলেন চন্দরপল। ৪১.৬৪ গড়ে ২৬৮  ম্যাচে করেছেন ৮,৭৭৮ রান। সেঞ্চুরি ১১টা। হাফ সেঞ্চুরি ৫৯। ভারতের বিপক্ষে বরাবর সফল ছিলেন। অনেকটা আশির দশকে জাভেদ পাকিস্তানের মিয়াঁদাদের মতো। আনঅর্থডক্স স্টান্স, স্ট্রোক প্লেতে মিলছিল না অথচ রান করেছেন ভূরি ভূরি। চন্দরপল সাধারণ ব্যাটিং পজিশনের সঙ্গে ৯০ ডিগ্রি কোণে স্টান্স নিতেন। ওভাবে খেলেই ভারতের বিপক্ষে ইনিংসপ্রতি রান তোলার গড় ৬৫.৭৪। সেঞ্চুরি ৭টি। ভারতের মাটিতে ৮ টেস্টে ব্যাটিং গড় ৫৩। টেন্ডুলকারের বিদায়ী সিরিজে সাফল্য পেলে গড়টা আরও ভালো হতে পারতো। ভিভ রিচার্ডস এবং গ্যারি সোবার্স বাদে ভারতের বিপক্ষে এত সফল আর কেউ নন। শেষ বছর ফর্মে ছিলেন না চন্দরপল। অথচ ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হোম সিরিজে সফল ছিলেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে দুই টেস্টে তার রান যথাক্রমে ৮৫*, ৮৪* এবং ১০১*। শেষ দশ বছরে চন্দরপলের টেস্টে ব্যাটিং গড় ৭০.৫৮।

উইন্ডিজের মিডল অর্ডারের ভার একা কাঁধে টেনেছেন চন্দরপল। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সীমিত ওভারের ক্রিকেটে উইন্ডিজ দলের মিডল অর্ডারে আমি ভারসাম্য এনেছিলাম।’ অথচ সাফল্যের তুলনায় বরাবর কম আলোচিত হয়েছেন। মুম্বাইয়ে টেন্ডুলকারের বিদায়ী টেস্টটি ছিল চন্দরপলের ১৫০তম। মাস্টার ব্লাস্টারের প্রচারমুগ্ধ ক্রিকেট দুনিয়া খেয়ালই করেনি আড়ালে থাকা চন্দরপলকে। কেউ একজন মাইলফলকের কথা মনে করিয়ে দিলে তিনি বলেছিলেন, ‘দেড়শো টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ কেউ রোজ রোজ পায় না। সেদিক দিয়ে আমার কাছে মুম্বাই টেস্ট অবশ্যই চিরস্মরণীয়। আর আমি নিজের দেড়শোতম টেস্টে ভালো খেলার জন্যও মুখিয়ে আছি। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপার, শচিনের বিদায়ী টেস্টটাই আমার দেড়শোতম টেস্ট হওয়ায় বাড়তি গর্ববোধ করছি।’ চন্দরপল এমনই। সবসময় প্রচারের আড়ালে থেকে নিজের কাজটা ঠিকভবে করে গেছেন। অপমানও সয়েছেন। ২০১১ সালের বিশ্বকাপের পর উইন্ডিজের নির্বাচকরা তাকে অবসর নিতে বলেন। তিনি শোনেননি। বাদ দেওয়া হয় তাকে। ওয়ানডে দলে আর ফিরতে পারেননি। অথচ ফর্ম বিবেচনায় তার বাদ পড়ার কথা নয়। ২০০৬ এর পর থেকে ২০১১ সালের মার্চ পর্যন্ত ওয়ানডেতে ৫৩ গড়ে ৩৪৯৭ রান করেছিলেন চন্দরপল।  

২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই টেস্টে টানা এক হাজার মিনিটের বেশি উইকেটে ছিলেন চন্দরপল। ‘এটা সম্ভব হয়েছিল কঠোর পরিশ্রমের কারণে। অজিরা আমাকে সেøজিং করেছিল। তাতে আমার সুবিধা হয়। যদিও আমাদের সিরিজ হারতে হয়েছিল। আসলে বিশ্বের সেরা দলের বিপক্ষে জিততে হলে দলের সবাইকে ভালো খেলতে  হয়। সেই সিরিজে আমরা অস্ট্রেলিয়াকে দুই ইনিংসে একবারও আউট করতে পারিনি।’ 

দল হিসেবে উইন্ডিজ যখন ডুবছে তখন ব্রায়ান লারার সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করতেন চন্দরপল। ত্রিনিদাদের রাজপুত্র ক্রিকেট ছাড়ার পর তার পাশে কেউ ছিল না। তা বলে লড়াই ছেড়ে তিনি পালিয়ে যাননি। ‘বাবা আমাকে বলতেন, ভালো-মন্দ যা আসুক বীরের মতো দাঁড়িয়ে থেকো, পালিয়ে যেয়ো না।’ উইন্ডিজের পরের প্রজন্মের জন্য এটাই চন্দরপলের শিক্ষা। তিনি সোবার্স-রিচাডর্স-লারার মতো স্টারডমের যোগ্য ছিলেন না। তাই হয়তো ৪৬তম জন্মদিনে তাকে কেউ মনে করবে না। অথচ ২২ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি যা করেছেন তা অন্যরকম যোগ্যতার স্মারক হয়ে থাকবে।