গুঁড়িয়ে দেওয়া রোহিঙ্গা গ্রামে পুনর্বাসন শিবির বানিয়ে সাংবাদিকদের ডাকে মিয়ানমার

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্যাতনে রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার আজ তিন বছর পূর্তি হচ্ছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সর্বশেষ মিয়ানমার থেকে বাস্তুহারা রোহিঙ্গা ঢল নামে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত দিয়ে। সেই সময় সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশটি থেকে আরও অন্ততপক্ষে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

বিষয়টি আন্তর্জাতিক নানা ফোরামে আলোচনা হলেও তিন বছরে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। বিভিন্ন সময়ে নিজেদের কলঙ্ক ঢাকতে গুঁড়িয়ে দেওয়া রোহিঙ্গা গ্রামের শিবির বানিয়ে সাংবাদিকদের দেখায় মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ।

মিয়ানমার সরকারের আয়োজিত এক সফরে গিয়ে বিবিসি'র সাংবাদিক জনাথন হেডের হয় তেমন এক অভিজ্ঞতা।  

পরে তিনি লিখেছিলেন— বিবিসি এমন অন্তত চারটি স্থান খুঁজে পেয়েছে যেখানে সুরক্ষিত স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। অথচ স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এগুলো আগে ছিল রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসতি।

তবে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা গ্রামে এসব স্থাপনা তৈরির অভিযোগ নাকচ করে সরকারি কর্মকর্তারা।

মিয়ানমারের সরকার সাংবাদিকদের হ্লা পো কং নামে একটি ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তারা দাবি করে, স্থায়ী আবাসে ফেরার আগে এই শিবিরটিতে ২৫ হাজার শরণার্থী দুই মাস ধরে থাকতে পারবে।

এই শিবিরটি এক বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল। তবে এখনো এর অবস্থা করুণ। এরই মধ্যে এর টয়লেটগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ২০১৭ সালের সহিংসতায় ধ্বংস হওয়া দুটি গ্রাম ‘হ রি তু লার’ এবং ‘থার হায় কোন’ নামে রোহিঙ্গা গ্রামের ওপর এই শিবিরটি তৈরি করা হয়েছে।

জনাথন বলেন, আমি যখন শিবিরটির পরিচালক সো শোয়ে অং-কে জিজ্ঞাসা করলাম যে গ্রাম দুটো গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো কেন, তখন কোন গ্রাম গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা অস্বীকার করলেন। কিন্তু যখন আমি দেখালাম যে স্যাটেলাইট চিত্রে এর প্রমাণ রয়েছে, তখন তিনি বললেন যে, তিনি কয়েক দিন আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।

এরপর কিয়েন চং নামে আরেকটি পুনর্বাসন শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জাপান এবং ভারত সরকারের সহায়তায় বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য। তবে এই পুনর্বাসন শিবিরটি তৈরির জন্য মিয়ার জিন নামে একটি রোহিঙ্গা গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই গ্রামটি ছিল নতুন করে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষা পুলিশ বাহিনীর জন্য বানানো একটি ব্যারাকের পাশে।

২০১৭ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর এই অংশটির বিরুদ্ধে ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিল রোহিঙ্গারা। ক্যামেরার পেছনে মিয়ার জিন গ্রামটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেন কর্মকর্তারা।

মংডু শহরের বাইরেই অবস্থিত মিও থু গাই নামে একটি গ্রামে একসময় ৮ হাজার রোহিঙ্গার বাস ছিল। জনাথন বলেন, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে, আরেকটি সরকারি গাড়িবহরে করে ভ্রমণের সময় ওই গ্রামটির ছবি তুলেছিলাম আমি। ওই গ্রামের অনেক বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বড় দালানগুলো অক্ষত ছিল। আর যে গাছগুলো রোহিঙ্গা গ্রাম বেষ্টন করেছিল সেগুলোও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এখন, মিও থু গাই গ্রামটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বড় বড় সরকারি স্থাপনা আর পুলিশ কমপ্লেক্স ছাড়া কিছুই চোখে পড়েনি। এমনকি সেই গাছগুলোও নেই।

আরও বলেন, আমাদের ইন দিন নামে আরেকটি গ্রামেও নিয়ে যাওয়া হয়। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ১০ জন বন্দী মুসলিম পুরুষকে হত্যাকাণ্ডের জন্য আলোচিত ওই গ্রামটি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অল্প যে কয়টি নির্যাতনের ঘটনা স্বীকার করে এটি তার একটি। ইন দিন গ্রামের তিন-চতুর্থাংশ বাসিন্দাই ছিল মুসলিম, বাকিরা রাখাইন বৌদ্ধ। এখন, মুসলিমদের কোন চিহ্ন নেই। রাখাইনরা চুপচাপ এবং শান্তিপূর্ণ।

এ দিকে দেশটির সেনাবাহিনীর অত্যাচার নির্যাতনের ভয়াল চিত্র উঠে এসেছিল জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশনের রিপোর্টে। ওই রিপোর্টে বিশ্বের সর্ববৃহৎ দেশহীন সম্প্রদায় বলে বর্ণনা করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের পথ সুগম করতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল ওই কমিশন।

বর্মী সেনাদের দ্বারা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নারীদের ব্যাপক হারে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর জাতিসংঘের কর্মকর্তারা একে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেন।

মিয়ানমার চাপের মুখে এত আয়োজন দেখালেও কার্যত থেমে আছে প্রত্যাবাসন।

সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া একেবারেই থেমে আছে। এর জন্য আমাদের চীন, ভারত এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সহসা জোট খুলবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে সরকার ও সরকারপ্রধান গত তিন বছর ধরে এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার কোনোভাবেই আন্তরিক নয়।